Friday, December 18, 2020

প্রশান্তিতে তাঁবুবাস

 

"Light a campfire and everyone's a storyteller"  

লেখক John geddes এর এই উক্তির মধ্যে ক্যাম্পিং আর গল্পের আসরের মধুর সম্পর্ক কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। শীতকালের প্রকৃত স্বাধ নিতে চাইলে তাবুবাস বা ক্যাম্পিং এর কোন বিকল্প নেই আর এই তাবুবাসের অন্যতম আকর্ষণ ক্যাম্প ফায়ার কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা গল্পের ঝুলি থেকেই কিছু লিখতে বসা আজ। "ক্যাম্পিং" শব্দটার সাথে প্রকৃতির আদিম এক অনুভূতি জড়িত। কয়েকজন মিলে নিখাদ প্রাকৃতিক পরিবেশে তাবু গেঁড়ে আড্ডা মুখর রাত্রিযাপন, নানারকম পাখি, অজানা পোকার শব্দ, গাছগাছালির ঘোর নীরবতা কিংবা কুয়াশার টপ টপ শব্দ মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। নগরের যান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে নৈস্বর্গিক পরিবেশে একটি রাত কাটানোর মুহূর্তগুলো দেয় অনাগত দিনে প্রাণবন্ত থাকার রসদ। 


কলেজে যখন বি.এন.সি.সি করতাম, তখন কর্নফুলী রেজিমেন্ট এর এয়ার উইং থেকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একখানা সাতদিনের ক্যাম্পিং করা হয়েছিল। প্রায় ন'বছর আগে সেই ছিল আমার প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা। শহুরে জীবনে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে বিজয় দিবসের ছুটিকে কেন্দ্র করে আরেকখানা ক্যাম্পিং ট্যুর এর স্বাধ নিয়ে নিলাম Share Basis Team এর বর্ষপূর্তি আয়োজনে।  


১৭ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার....ঢাকা থেকে আসার পর থেকে বন্ধু ও ছোট ভাইদের সাথে দেখা করতে সকাল থেকে জিইসি ছিলাম। যোহরের সালাত ও দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর রওনা দিলাম কাপ্তাই রাস্তার মাথা'র উদ্দেশ্যে। খানিকটা জ্যাম থাকার কারণে কাটায় কাটায় সাড়ে তিনটায় পৌঁছলাম রাস্তার মাথা। এরপর ট্যুর এডমিন রুপম ভাইয়ের সাথে দেখা, আমি আসার ঠিক দু'মিনিট আগেই নাকি এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটে গেছে যার রেশ ছিল তাবুতে ঘুমাতে যাবার আগ মুহূর্তে। যাই হোক, খানিক বাদেই আরেক এডমিন ফারজানা আপু চলে এলেন। এরপর আমরা সিএনজি তে উঠে পড়লাম....আবার সেই ম্যারাথন সিএনজি জার্নি। এক-দেড় ঘন্টার রাস্তার মাথা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত এই সিএনজি ভ্রমণে আমার বরাবরই হাত-পা ব্যাথা হয়ে যায়...তার উপর এমন ঘুম আসে। প্রায় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কাপ্তাই প্রশান্তি পার্কের সামনে এসে থামলো আমাদের গাড়ি, সন্ধ্যে নামতে আর কিছুটা সময় বাকি। পার্কে ঢুকতেই মনটা জুড়িয়ে গেল, কর্নফুলীর পাড় ঘেষে গড়ে উঠা এই পার্ক ও ক্যাম্পিং স্পটের প্রায় পুরোটাই ঘন গাছ-গাছালিতে ভরপুর। সাথে সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলের লেক, কায়াক, মাচা, কুঁড়েঘর, দোলনা, বাগান আর হ্যামক যেন একটা জম্পেশ ক্যাম্পিং এর পরিবেশ সাজিয়ে বসে আছে ভ্রমণপিয়াসীদের জন্যে। 

এদিক ওদিক একটু হাটাহাটি করেই একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিলাম, সামনেই কর্মব্যস্ত দিনগুলোর জন্যে ভালোই রশদ জোগাড় হবে এই ট্যুর থেকে। এরপর পার্কের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিলাম। নামাজ শেষে আমাদের ক্যাম্পিং স্পট এ এসে দেখলাম ইতোমধ্যেই গ্রুপের অধিকাংশ এসে পড়েছে, হাতে হাত লাগিয়ে একে একে তাবু বসানো শুরু করে দিলাম। প্রায় সত্তর জন মানুষের জন্যে তাবু ভাড়া করে আনা হয়েছে, তাই একের পর এক তাবু বসাতে হচ্ছিল। রুপম ভাই, আমি আর সাদমান মিলে মোটামুটি বেশ ক'টা তাবু খাটিয়ে নিলাম। এরপর নাস্তা, ডিনার আর ব্রেকফাস্ট এর কুপন বিলি করা হলো....বরাবরের মতো কুপন থেকে বেশ কিছু আকর্ষণীয় পুরস্কারের বন্দোবস্ত ছিল এবারের ট্যুরেও। সন্ধ্যার নাস্তা শেষ করে বাকি তাবুগুলো বসানোর কাজ শেষ করলাম। এরপর সেই সাজেক ট্যুরের চিঠির আবিষ্কারক সৈকত ভাইয়ের সাথে দেখা, সৈকত ভাই আর মিস্টার রিলাস্ক ট্যুর মাসুম ভাইয়ের সাথে বেশ ক্ষাণিক্ষণ গল্প-আড্ডা চলল। এবারের আড্ডায় সৈকত ভাইয়ের নতুন এম মতামত প্রবর্তন করলেন....


"বিয়ে হচ্ছে নাকি ওয়াশ রুমের মতো, যারা বাইরে আছে তারা ভেতরে আসতে চায়....আর যারা ভেতরে আছে তারা বেরিয়ে আসতে চায়"


আমার অধিকাংশ ট্যুরের ট্রেকিং পার্টনার ছোটভাই মীর এরই মধ্যে তার জনা-সাতেক এর টিম নিয়ে উপস্তিত হলো। আগের বিভিন্ন ট্যুরের পরিচিত ভাইদের সাথে দেখা হচ্ছিল, আবার নতুন কিছু মুখের সাথেও পরিচিত হচ্ছিলাম। সত্যিই এ যেন আরো এক পরিবার, ভ্রমণেই যাদের নেশা ভ্রমণেই যাদের বন্ধুত্ব। রাত বাড়ার সাথে সাথে একে একে সবাই আসা শুরু করল পার্কে, আরো দুয়েকটা গ্রুপের ক্যাম্পিং ছিল আশেপাশে। লেকের পাড়ে মাচায় একটা গ্রুপ বিশেষ একটা খেলার আয়োজন করেছিল, ওটা দেখতে দেখতেই হঠাৎ এক পরিচিত কণ্ঠস্বর..

-আরেহ, সানি না? কেমন আছ? 

-এইত ভালো আপু, আইমুন আপু না?

-হ্যাঁ, কাদের সাথে আসছ?

-এইতো, আমাদের একটা ট্যুর গ্রুপের বর্ষপূর্তি ক্যাম্পিং।

-ভালোই, আমি তেমন একটা ট্যুর দেইনা। এটাই প্রথম আউটিং। 


আইমুন আপু ভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্ট এর সিনিয়র। ভার্সিটি তে রোবোটিক্স এর কাজের সূত্রে আপুর সাথে পরিচয়। নিচ থেকে উপরে উঠে আসতেই মীর আমাকে প্রশ্ন করল

-কি ভাই, কবে থেকে এ? আপনারে তো ভালোমানুষ ভাবছিলাম। 

-আরেহ, ভার্সিটির সিনিয়র আপু....হা হা হা।


রাত নটার দিকে আমরা সবাই রাতের খাবার সেরে নিলাম, এরপর যে যার মতো এদিক ওদিক একটু হাটাহাটি। ঠিক এই সময়টাতে আইমুন আপুদের গ্রুপ থেকে জমে উঠল গানের আসর। ক্ষণিকের জন্য ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে যেন ফিরে গেলাম। গানর আসর শেষে আমাদের গ্রুপ থেকে হলো আপুদের মিউজিকাল পিলো-পাসিং আর ভাইদের জন্যে মোরগ লড়াই। মোরগ লড়াই আসতেই আমার স্কুল লাইফের কথা মনে পড়ে গেল। একবার ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় সাহস করে মোরগ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলাম... ক্লাস সেভেনের এক সিনিয়র এমন ধাক্কা দিয়েছিল মুখ থুবড়ে পড়ে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছিলাম।সেই থেকে এই ইভেন্ট এর দূরে দূরে থাকি, এবারও ব্যাতিক্রম হলো না। মোরগ লড়াই এ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভাইকে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বেশ ক'বার মোরগের ডাক দিতে হলো। 



এরপর শুরু হলো কুপনের পুরস্কার বিতরণী আর বার্বি কিউ। আমরা ক'জন গিয়ে কাঠ নিয়ে ক্যাম্প ফায়ারের বন্দোবস্ত করলাম। শীত যখন আমাদের উপর জেঁকে বসছিল ঠিক তখনই এই আগুনের উত্তাপে ক্যাম্প কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। আগুনের চারপাশে গোল করে জমে উঠল গল্প-আড্ডার আসর। এর ফাঁকে ফাঁকে কুপনের পুরস্কার বিতরণ করা হচ্ছিল মঞ্চে... মজার মজার সব পুরস্কারে ভরপুর ছিল মঞ্চ। প্রথম পুরস্কার ছিল একটা তাবু, দ্বিতীয় একটি হ্যামক....এই দুটোই ছিল সর্বমোট একুশ টি পুরস্কারের মূল আকর্ষণ। কিছু সময় পরপর আগুনে কেরোসিন ঢেলে বেশ আগুনের ফুলকির আলোতে আলোকিত করছিলাম চারপাশ। আগুনের পাশে বসে বসে ভাবছিলাম ফেলে আসা দিনগুলোর কথা....স্মৃতির পাতায় কতো সুখস্মৃতি এভাবে কাঠের মতো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আবার সেই আগুনেরই উত্তাপ পেয়ে জেগেছে হাজারো নতুন স্বপ্ন। এভাবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার কুপনের নাম্বারের ডাক শুনতে পেলাম, নবম পুরস্কার হিসেবে পেলাম একটা মোবাইল এর ওয়াটার প্রটেকটর ব্যাগ।





এভাবে একে একে কুপন তোলা হচ্ছিল ও পুরস্কার বিতরণ পর্ব চলছিল। শাহজাহান ভাই পেলেন দ্বিতীয় পুরষ্কায় হ্যামক আর কুমিল্লা থেকে আসা সুজন ভাই জিতে নিলেন আকর্ষণীয় একটি তাবু। পুরস্কার বিতরণী শেষ হতে হতে রাত তিনটে বেজে গেছে প্রায়...গল্প-আড্ডা আর মজায় সমগুলো খুব দ্রুতই কেটে যাচ্ছিল।এরপর পরোটা আর বার্বি কিউ দিয়ে চলল লেট নাইট আহার... ডিনার যেহেতু আগেই করেছি...তাই একে লেট নাইট আহার বলাই সাজে। আহার শেষে একে একে যে যার তাবুতে ঘুমানোর আয়োজন করছিলাম। আমার তাবুমেট ছিলেন সৈকত ভাই আর মাছুম ভাই। সৈকত ভাই পুরো কম্বল নিয়ে এসেছেন... যদিও চাদর ছিল আমাদের কাছে। অবশ্য কম্বলের উষ্ণতা পেয়ে ঘুমটা ভালোই হয়েছে, তাবুর উপর টপ টপ করে পড়তে থাকা শিশিরের শব্দ, ঘন জঙ্গলের শুনশান নীরবতা নিয়ে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালাম। 

খানিক বাদেই তীব্র শব্দে জেগে উঠি, প্রথমে ভেবেছিলাম কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার তাবুর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। পরে আবিষ্কার করলাম মাছুম ভাই তীব্র শব্দে নাক ডাকছেন, যা সত্যিই এক ভয়ঙ্কর বুনো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অনেক কষ্টে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম ভাঙার পর দেখি তাবুতে কেবল আমি আর সৈকত ভাই...মাসুম ভাই গায়েব 😄😄।  তাবু থেকে দুজনে মাথা বের করি দেখি অনেক কুয়াশা আশেপাশে...সৈকত ভাই আশেপাশে এক চক্কর মেরে এসে বললেন..."অনেক কুয়াশা, ছবি ভালো হবেনা...আরেকটু ঘুমাই নেই"। মীর এসে ডাকাডাকি করল, কিন্তু রাতে ঠিকঠাক ঘুম না হওয়ায় আরেকটু ঘুমিয়ে নিলাম। এরপর সকাল সাতটায় উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমি আর সৈকত ভাই মিলে কিছু ছবি মুঠোফোনে বন্দী করে নিলাম। এরপর সবাই মিলে সকালের নাস্তা শেষ করে গ্রুপ ফটো তুলে যার যার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।







Friday, November 27, 2020

জমিদারবাড়িতে হানা



শিরোনাম দেখেই চমকে গেলেন? ভাবছেন, আমি আবার কবে থেকে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা সিরিজ লেখা শুরু করলাম! সত্য বলতে কি আজকে এক রকম হানাই দিতে হলো জমিদারবাড়িতে। গাজীপুর আসার পর থেকেই কাজের ব্যাস্ততায় ঘোরাঘুরি একদমই বন্ধ হয়ে গেল, ঠিক যেন দম আটকে আসছিল...ন'টা থেকে ছ'টার জীবন। ইচ্ছে করলেই বেড়িয়ে পড়তে পারছিলাম না। এমনিতে চন্দ্রায় আসার পর আশেপাশে প্রচুর হাটাহাটি হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, ম্যাপে দেখেলাম কাছেই দু-দুটি জমিদারবাড়ি আছেঃ


১.বলিয়াদি জমিদারবাড়ি 

২.শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ি


আর তাই আজকের এই ছুটির দিনটিকেই বেছে নিলাম জমিদারবাড়িতে হানা দেয়ার জন্যে। সাথে ছিল কলিগ  Chayan Mistry , মিস্ত্রী সম্পর্কে যদি কিছু লিখার হয় তবে লিখব খুবই আন্তরিক এবং আমার মতোই প্রযুক্তি নিয়ে পাগল। যাই হোক, জুমার নামাজ শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়েদেয়ে দুপুর তিনটায় বেরোলাম দুজনে, বাড়ইপাড়া হয়ে রিকসায় গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বলিয়াদি যাওয়ার যাবে। 


যেতে যেতে বলিয়াদী জমিদারবাড়ি সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক...

গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বলিয়াদী ইউনিয়নে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলিয়াদী জমিদার বাড়ী (Baliadi Jamider Bari) অবস্থিত। ১৬১২ খৃস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান বলে প্রতিষ্ঠিত বলিয়াদী এস্টেটের প্রথম কর্ণধর খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) বংশধর কুতুব উদ্দিন সিদ্দিকীর পুত্র সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী। বর্তমান বলিয়াদী এস্টেটের মোতওয়াল্লী চৌধুরী তানভীর আহম্মদ সিদ্দিকী ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) ৩৭তম বংশধর। বলিয়াদী জমিদার বাড়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত কোন সম্পত্তি নয় এবং জমিদারদের বংশধরাই বর্তমানে এই বাড়ির মালিক। 


যেতে যেতে আশপাশের গ্রামীণ সৌন্দর্যে মনটা অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। ধলেশ্বরীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা এই সুবিশাল জনপদের অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কবিতার প্রিয় ক'টি লাইন...

"যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে অপরাজিতার মতো নীল হ’য়ে- আরো নীল-আরো নীল হ’য়েআমি যে দেখিতে চাই;- সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে ল’য়ে কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে,আমি যে দেখিতে চাই;- আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে।"

প্রায় মিনিট ত্রিশেক পর আমরা এসে পৌঁছলাম বলিয়াদি জমিদারবাড়ির সামনে, এই যাত্রায় গুগল ম্যাপই ছিল আমাদের একমাত্র ভরশা। রিকশা থেকে নেমে হেঁটে চললাম ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর খোঁজে। কিছুদূর গিয়েই পেলাম সুবিশাল লন, সামনেই পড়ল বলিয়াদী এস্টেট এই সুবিশাল ফটক আর একপাশে মসজিদ। আরেহ, এই তো সেই জীবনানন্দের কবিতার ঘাষ...আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাষে!  খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করার পর জানতে পারলাম দর্শনার্থীদের জন্যে জমিদারবাড়ি উন্মুক্ত নয়। যাহ, সব আশায় গুড়েবালি...আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল, যেহেতু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই জমিদারবাড়ি অধিগ্রহণ করেনি তাই এখানে কেবল বর্তমান এস্টেট এর মালিকের হুকুমই চলবে। তারপরও আশাহত না হয়ে এদিক ওদিক হাটাহাটি করছিলাম, যদি কোন সুযোগ মেলে আরকি। কিছুক্ষণ পর দেখলাম জনা-সাতেক ছেলেপিলে মূল ফটক টপকে ভেতরে ঢুকছে। আমি তখন মিস্ত্রীকে বললাম...


- কি ভাই, হবে নাকি? দেয়াল টপকে জমিদারবাড়ি তে হানা? 

- আরে না না ভাই, আরো কিছুক্ষণ দেখি।

এরই মধ্যে বাইক নিয়ে তিনজনের একটা ছোট গ্রুপ আসল। আমরাও অনেক আশা নিয়ে তাদের সাথে গেটের সামনে গেলাম। ওই গ্রুপের এক ভাই খানিকক্ষণ হাঁকডাক করলে পরে ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলো, কিন্তু আমাদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও গেট খোলা যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়ে চলে গেল। মনে মনে জমিদার আর তার বংশধরের গুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলছিলাম আর ঠিক করে নিলাম ভেতরে ঢুকবই ঢুকব। আশপাশটা ভালভাবে দেখে পেছনের ফটকের দিকের সীমানা পাঁচিল এর নিচে দেখলাম মাটি অনেকটা দেবে গিয়ে বড়সড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে...যে গর্ত দিয়ে সহজেই ঢুকে যাওয়া যাবে।

গ্রামের সিঁধ কাটা চোরের মতো অবস্থা আমাদের, একে একে মিস্ত্রী আর আমি ঢুকে পড়লাম পাঁচিলের নিচের গর্ত দিয়ে, বেশ একটা থ্রিল থ্রিল ফিল এসে গেল। বিকেল বেলায় বিশাল দীঘির পাড় ঘেষে থাকা ঘন গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছিলাম আমরা, কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। মিনিট দুয়েক হেঁটেই জমিদারবাড়ি পেছনের খোলা ফটক দিয়ে ঢুকে পড়লাম, কিন্তু ভেতরা থাকা নিরাপত্তা প্রহরীর চোখে পড়ে গেলাম। প্রহরী ব্যাটা হাঁকডাক করতে করতে বাড়ির আশেপাশে ঘুরে দুয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। 

যদিও ফটক টপকে ঢুকা ওই জনা-সাতেক এর দল ভেতরে এসে আড্ডা দিচ্ছিল, বুঝতে পারলাম.. এরা এলাকার ছেলেপিলে... তাই এদের প্রহরী কিছুই বলছে না। যাইহোক, ঢুকব বলে ঠিক করেছিলাম...ঢুকে ছাড়ছি। এরপর প্রহরী প্রধান ফটক খুলে দিলে পরে আমরা বেরিয়ে আসি।




বেরিয়ে এসে আমাদের মনটা ঠিক ভরল না, যদিও মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন খুব কাছ থেকে দেখে কিছুটা প্রাপ্তি কাজ করছিল...কিন্তু বাড়ির ভেতর ঢুকে কামরাগুলো দেখতে না পারার আফসোস থেকেই গেল। ওদিকে কাছেই আছে শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ি। ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করলাম এরপর। কিন্তু এখানে এসেও দেখি একই অবস্থা, ভেতরে ঢুকতে দেবে না। পাঁচিলটা বেশ মজবুত আর আশেপাশেও কোন ফাঁক-ফোকর পেলাম না, বাইরে থেকে দু-চারখানা ছবি তুলে নিয়ে আবার চন্দ্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।


Saturday, November 21, 2020

এক টিকেটে পাঁচ ছবি



এক টিকেটে পাঁচটি ছবি- আর সেই টিকেটের দাম মাত্র ৩৭০ টাকা... সাথে লাঞ্চ,স্ন্যাকস আর চা-নাস্তা ফ্রি, শিরোনাম দেখেই অনেকে হয়তো ঘাবড়ে গেছেন...ঘাবড়ানোর কিছু নেই, আসলেই সম্ভব। এই লেখাটা পড়লেই বুঝতে পারবেন।

>বেকার মানুষ আমি, কোন কাজবাজ নাই। বেশ কদিন ধরে ডে-ট্যুর দেয়ার জন্যে মনটা আঁকুপাঁকু করছিল। তার উপর লাইফ এর রশদও ফুরিয়ে আসছিল। ছোট ভাই Mir H Mamun হঠাৎ পরশু নক দিয়ে বলে- ভাই, চলেন..রোববার ১ টিকেটে ৫ ছবি দেখে আসি।

যেই কথা সেই কাজ, একদিনেই একে একে খেলে দেয়া হলো চন্দ্রনাথ, সহস্রধারা-২, হরিনমারা ঝর্না, হাটুভাঙ্গা ঝর্না আর কুমিরা ঘাট। আগের মতো বিশাল ভ্রমণ কাহিনী লিখার মতো কলম ও কালি হারিয়ে আর ফুরিয়ে গেছে, তবুও ছোট ভাই মীরের অনুরোধে মুঠোফোনে লিখবার চেষ্টা। 🤪

ভোরে ফজরের সালাত আদায় করেই আল্লাহর নাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়া, গন্তব্য এ.কে.খান। সাতটার মধ্যেই হাজির হলাম এ.কে.খান, কিছুক্ষণ পরই আসল ছোট ভাই মীর....কোন প্যারা নাই- দুই জনের Duo-Adventure. মীরের ভাষায় যতক্ষণ শরীরে কুলোয় দুই চোখ যেদিকে যায় ঘুরব সারাদিন।

#চন্দ্রনাথ_পাহাড়ঃ প্রথমেই একেখান থেকে বাসে উঠে প্রায় একঘন্টা বাসজার্নির পর নামলাম সীতাকুণ্ডে, নিচে নেমে হালকা চা-নাস্তা করে কলেজ রোড় এর মোড় থেকে অটোতে করে চলে গেলাম ১২০০ ফিট উঁচু পাহাড়ে ক্যালরি কমাতে 😂। ভোরবেলা আশপাশটা কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন লাগছিল, হয়তোবা এ শীতের আগমনী বার্তা। মীর বারবার হাঁপিয়ে পড়ছিল, যদিও অন্যান্যদিন ওর এমনটা হয়না। আমার হার্টের অবস্থাও যে খুব একটা ভাল ছিল তা নয়, বিগত কয়েকদিন ধরে প্রচুর ধকল নিতে নিতে হার্ট একরকম ক্লান্ত। তবুও এডভেঞ্চার এর নেশা যে মোদের পিছু ছাড়ে না। চলতে চলতে সামনে পড়ল বিরুপাক্ষ মন্দির, মন্দিরের পাশে বেশ ক্ষাণিক্ষন জিরিয়ে নিলাম। মৃদুমন্দ বাতাস আর বৃক্ষরাজির সুশীতল ছায়া আমাদের ক্লান্তি কিছুটা হলেও উপশম করে দিচ্ছিল। এরপর আবার যাত্রা শুরু করলাম, আরো খানিকটা পথ বাকি। খাঁড়া পাহাড়ের ঢালগুলো বাইতে বাইতে এক সময় এসে পৌঁছলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়, কিছুটা সামনেই চন্দ্রনাথ মন্দির। পাক্কা এক ঘন্টা লেগেছে আমাদের। আমরা মন্দিরের সামনে পাহাড় ঘেষে থাকা রেলিং এ ক্ষানিকটা বিশ্রাম নিয়ে নিলাম আর দুই ভাই আড্ডার মাঝে নিজেদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খাতা খুলে বসলাম। এরপর কিছু ছবি মুঠোফোনে বন্দী করে নামার সিঁড়ি ধরলাম। নামার পথটুকু খুবই রোমাঞ্চকর যদি আপনি জাত ট্রাভেলার হোন, নয়তো ধীরে ধীরে নামাটাই উত্তম। আমরা এক রকম দৌড়ে দৌড়েই নেমে পড়েছিলাম, সময় লেগেছিল মিনিট বিশেক এর মতো। ঘড়িতে দেখি মাত্র এগারোটা বাজে, এরপরের গন্তব্য সহস্রধারা-২ এ যাবার উদ্দেশে আমরা আবার প্রধান সড়কে ফিরে এলাম।





#সহস্রধারা_২ঃ সীতাকুণ্ড থেকে লেগুনায় চড়ে ছোট দাওগারহাট এসে নামলাম। এরপর লোকাল সিনজি-তে করে সোজা সহস্রধারা-২। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে একখানা লেক, বোটে করে এই লেক পেরোলেই ঝর্না আপুর দেখা পাওয়া যাবে। আমরা বোটে করে পৌঁছতেই দেখি ঝর্না আপু তার উন্মত্ত যৈবন নিয়ে ঝরে পড়ছে সহস্রধারায়। দুদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় ঝর্নাতে বেশ ভালোই পানি পেয়েছি আমরা। আমি আর মীর পানিতে নেমে ঝর্নার কাছে যেতেই হঠাৎ করে যেন ঝর্নার পানির গতি বেড়ে গেল , মাথা আর পিঠের উপর করছিল যেন কেউ অবিরাম গুলিবর্ষণ। রোববার হওয়াতে আজকের পরিবেশ মোটামুটি নিরিবিলি ছিল। যাই হোক, ঝর্নার নিচে বসে অনেক্ষণ একান্তচিত্তে ভিজলাম। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলাম আর বারংবার বলছিলাম সুবহানআল্লাহ, আল্লাহু আকবর।

 



ঝর্নায় গোছল শেষ করে মুঠোফোনে কিছু ছবি ধারণ করে বোটের জন্যে অপেক্ষায় রইলাম। এরপর বোটে করে পূর্বের স্থানে এসে লোকাল

সিএনজি করে আবার ছোট দারোগারহাট ফিরে এলাম। ঘড়িতে সময় তখন দুপুর দেড়টা, এরপরের লক্ষ্য ছোট কমলদহের হরিনমারা ঝর্না।

 

#হরিনমারা_ট্রেইলঃ লেগুনা থেকে ছোট কমলদহ নেমে রওনা করলাম হরিনমারা ঝর্নার উদ্দেশ্যে। সাথে জুটেছিল জনা সাতেকের মত আনকোরা পর্যটক। ওদেরকে আমরা দুজন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে মীর একটা মজার ফন্দি আটলো-

-সানি ভাই, চলেন আমরা আমাদের ১ নম্বর গিয়ারে হাটা শুরু করি।

-কি বলো?  ওরা তো পিছাই পড়বে।

-আরে সমস্যা নাই ভাই, একটাই রাস্তা। একটু মজা না করলে কি হয়?

এরপর আমরা আমাদের সচরাচর ট্রেইলের বেগে হাটা শুরু করলাম, মিনিট পাচেক পর পেছনে ফিরে দেখি ওই দলটির কোন অস্তিত্ব নেই। এরপর আরো মিনিট পাচেক অপেক্ষা করে দেখলাম ওরা সৈনিকদের মতো দৌড় করতে করতে আসছে। আমাদের এমন হাসি পেলো, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম। পাশেই মীরের মামাবাড়ি, তাই আমাদের একটু ঘুরতি পথ ধরতে হলো। আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে আমরা এখানেও এক লেকের সামনে এসে পড়লাম। আনকোরা ট্যুরিস্ট দের দল খাবার হোটেলে ঢুকে বেরুনোর কোন নামগন্ধ নিল না...আমি আর মীর আমাদের মতো চলতে শুরু করলাম। লেকে কেবল একটাই বৈঠা চালিত নৌকা। যদিও পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায় ঝর্নায়, কিন্তু লেকের পানি বেড়ে যাওয়াতে অপেক্ষাকৃত সহজ রাস্তাটি পানিতে ডুবে গিয়েছিল। বোটে না গিয়ে আমরা একটু ঘুরতি পথের রাস্তাটা ধরলাম। উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঝোপ-ঝাড় আর পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথ বেয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সূর্য তখন ঠিক আমাদের মাথার উপর। প্রায় ত্রিশ মিনিটের ট্রেকিং শেষ করে ঝিরির দেখা পেলাম, সেই ঝিরি ধরে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল হরিনমারা ঝর্না। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই, কেবল আমি আর মীর। পরিবেশটাও কেমন গা ছমছমে। এরপর মুঠোফোনে কিছু ছবি তুলে নিয়ে মীর আর আমি আবিষ্কার করলাম আমাদের জোঁকে ধরেছে, জোঁক ছাড়ানো শেষে যোহরের সালাত আদায় করে নিলাম। এরপর হাটুভাঙ্গা ঝর্নার উদ্দেশ্যে পা বাড়ানো।

 

#হাটুভাঙ্গা_ঝর্নাঃ হরিনমারা ঝর্না শেষে পাশেই আরো দুটি ঝর্না আছে। আমরা হাটুভাঙ্গা তেই যাবো বলে ঠিক করলাম, দেখি কেমন হাটু ভাঙতে পারে আমাদের। বেশ ক্ষাণিক্ষণ ঝিরিপথ ধরে ট্রেইল শেষে দেখি ঝর্নাটা বেশ ভালোই, তবে পিচ্ছিল এবং উঁচু। খুব সম্ভবত এই ঝর্না বেয়ে কেউ উঠতে গিয়ে হাটু ভেঙেছিল। আমি এডভেঞ্চার এর লক্ষ্যে ঝর্না বেয়ে উঠতে গেলে মীর আমাকে হাটু ভাঙার ব্যাপারে সতর্ক করে, পরে অর্ধেক উঠে নেমে যাই। এরপর বেশ কিছু সেলফি আর ঝর্নার ছবি তুলে ফেরার পথ ধরি। ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল সেই ট্যুরিস্ট দল এর সাথে....তারা নাকি আমাদের এক পর্যায়ে জ্বিন ভেবে বসেছিল...হঠাৎ হঠাৎ আমরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলাম...আবার খুব দ্রুত ট্রেইল শেষ করে ওদের আগে ফিরে যাচ্ছি। 😆😆😆

ফিরে যাবার পথে অবশ্য আমরা ভুল পথে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলি, যেই পথটা লেকের পানিতে ডুবে গেছে। পরে আবার মিনিট বিশেকের প্রচেষ্টায় পথ খুজে পাই...এই সময়টা খুব রোমাঞ্চকর ছিল আমাদের দুজনের জন্যে। ঝর্নার ট্রেইল সব শেষ করতে করতে বিকেল চারটা বেজে গিয়েছিল। ওই এলাকার সুপরিচিত "ড্রাইভার হোটেল" এ মাত্র ১৬৫ টাকায় চিকেন দিয়ে দুজনে লাঞ্চ মেরে দিলাম 😂। এরপর সূর্যাস্ত দেখার পালা...উদ্দেশ্য কুমিরা ঘাট।

 


#কুমিরা_ঘাটঃ ছোট কমলদহ থেকে একটা লোকাল ডিস্ট্রিক্ট বাসে চড়ে বড় কুমিরা ঘাটে এসে নামলাম। ঘাটে পৌঁছানোর জন্যে নিচে নেমে রিকসা নিতে হলো, আমরা তখন ঘাট থেকে খানিকটা দূরে....টকটকে লাল সূর্য অস্ত যাবার অপেক্ষা করছে। সূর্যাস্ত যে এতোটা সুন্দর হতে পারে, আজ খুব কাছ থেকে তা উপভোগ করলাম। সূর্য অস্ত যেতে না যেতেই আকাশের একপাশে চাঁদের দেখা পেলাম। প্রকৃতি যেন আজ তার সব রুপ ঢেলে দিয়েছে আমরা আসব বলে। খানিকটা সময় ঘাটে কাটিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম।

 


#পুনশ্চঃ প্রিয় শহর ছাড়ার আগে খুব সম্ভবত আজকের এই ট্যুরটা আমার শেষ ট্যুর। বহুদিন স্মৃতি হয়ে থাকবে আজকের মুহূর্তগুলি।

লুসাই নদীর খোঁজে



মহামারীর টানা লকডাউনে গণহারে সবাই যখন বিয়ে করতে ব্যাস্ত ঠিক তখন টানা ছয়মাস ঘরবন্দী থেকে কোথাও ট্যুর দিতে না পেরে অতিষ্ঠ আমার মতো হাজারো ভ্রমণপিপাসুদের মন। একশ্রেণী যেমন ভাবছে... বাঁচামরার ঠিক নাই বিয়েটা করেই নেই, তেমনি আরেক শ্রেণী ভাবছে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির অদেখা অপার সৌন্দর্য উপভোগ করে নেই। একেকটা ট্যুর শেষে আমরা বেঁচে থাকার যেসব রশদ জোগাড় করি,সেই রশদের সাথে অন্যকিছুর তুলনা হয় না। ট্যুরিস্ট স্পটগুলো খুলে দিতেই তাই ভ্রমণপিয়াসীদের উপচে পড়া ঢল।  আগে ট্যুর শেষে তুলে রাখা ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে থাকতো, আর এখন ছবির পাশাপাশি প্রতিটা ট্যুর শেষে এই স্পেশাল ভ্রমণ কাহিনী লিখা...যাতে করে আদ্যোপান্ত পড়ে আবারো ফিরে যেতে পারি মুহূর্তগুলিতে। আগের লেখা ভ্রমণকাহিনী পড়ে অনেকেই একে রচনা বলে আখ্যা দিয়েছেন, একটু বড় হলেও আশা করি পুরোটা পড়ে নিরাশ হবেন না।

 

কাহিনীর শুরু আমার দেখা একটা স্বপ্ন দিয়ে। একদিন রাতে স্বপ্নে দেখলাম সাদা মেঘের উপর উড়ে বেড়াচ্ছে নীল শাড়ি পরা এক পরী...আর আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম

- "আমাকে নিয়ে যাবে ওই মেঘের রাজ্যে?"

উত্তরে সে পরী 'না' বলে মুখ ভেংচিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। রহস্যময়ী পরী অদৃশ্য হয়ে গেলেও আমি মনস্থির করে ফেললাম মেঘের রাজ্যে যাবোই যাবো। হঠাৎ করে Share Basis Tour গ্রুপ থেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেক ট্যুরের ঘোষণা এলো, ব্যাস কনফার্ম করে পঁচিশ তারিখ ভোরেই আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বায়জিদ বাস কাউন্টার এর উদ্দেশ্যে।

 

শহরের আকাশে ছিল কালো মেঘের আনাগোনা, সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে সবসময় ট্যুর দেয়া হয়ে উঠেনা, তার উপর যাচ্ছি মেঘের রাজ্যে...এ তো সোনায় সোহাগা। শান্তি পরিবহন এর বাসে উঠলেও যাত্রাপথের নানা অশান্তি উঁকি মেরে বসে ছিল আমাদের জন্যে। অক্সিজেন বাস কাউন্টার থেকে বাকিসব যাত্রীদের নিয়ে সকাল সাড়ে সাতটায় আমাদের বাস রওনা দিল খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ফতেয়াবাদ, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি পেরিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর বাস যাত্রাবিরতি দিল মানিকছড়ি বাজারে। সকালের নাস্তা শেষ করে বাসে উঠে আরো দেড় ঘন্টার বাসভ্রমণ।  মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়ে বাস ঢুকল খাগড়াছড়ি। কিছুদূর গিয়ে আমরা নেমে পড়লাম আলুটিলা পর্যটন কমপ্লেক্সে। টিকিট কেটে কিছুদূর গিয়েই মুগ্ধ হই বৃষ্টিস্নাত আকাশে মেঘের ভেলা দেখে। খুব কাছ থেকেই মেঘের আনাগোনা উপভোগ করছিলাম, সাথে টিপটিপ বৃষ্টি। গুটিকয়েক ছবি তুলে আমি, মীর আর আশরাফ চললাম গুহার পথে। আমাদের ২২ জনের টিমের চার-পাঁচজন এলো আলাদা গ্রুপে, বাকিরা সবাই গল্প,আড্ডা,ছবি তোলা আর মেঘ ও বৃষ্টি উপভোগে ব্যাস্ত। ট্যুর এডমিন রুপম ভাই বললেন সামনেই মশাল পাওয়া যাবে...গুহায় খুব অন্ধকার, যাতে ঢুকতে মশাল নিয়ে যাই। হাঁটতে হাঁটতে সামনে পড়ল এক বিশাল অশ্বথ গাছ…দিনের আলো না থাকলে পুরোপুরি ভূতুড়ে পরিবেশ বলা যেত। আরেকটু হেঁটে সামনে যেতেই পেলাম গুহায় ঢুকার মুখ, কিন্তু আশেপাশে কোন মশাল বিক্রেতাকে না দেখে সাহস করে মোবাইলের ফ্লাসলাইটে ভরসা করেই ঢুকে পড়লাম গুহায়। আমাদের চারজনের টিমকে সামনে থেকে লিড করে যাচ্ছিলাম। অন্ধকারে পথ চলতে আমার কখনোই অস্বস্তিবোধ হয়না, আমি আশা করছিলাম আরো বেশি কিছু…চিপা-চাপা দিয়ে কষ্ট করে যেতে হবে কিংবা একঝাক বাদুড়ের দলের দেখা পাবো এমন এডভেঞ্চার কিছু। অবশ্য ভেতরে এতোটাই অন্ধকার ছিল যে একহাত দূরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, নিচে বয়ে যাচ্ছিল গোড়ালি সমান পানির স্রোত। হাঁটতে হাঁটতে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আলোর মুখ দেখতে পেলাম আর সবাই মিলে ছবি তুলে গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম।

 

আলুটিলা গুহা থেকে বেরিয়ে দলের বাকি সবার সাথে একত্র হয়ে উপরে উঠে এলাম, এরপর চলে এলো আগে থেকে ভাড়া করে রাখা আমাদের চান্দের গাড়ি দুটি। ১১ জন করে প্রতি গাড়িতে উঠে আমরা চললাম তারেং পাহাড়ের চূড়ায়। প্রচন্ড গতি নিয়ে আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ে উঠছিল তখন ছাদের উপরে থাকা আমরা সবাই মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গেলাম অন্য জগতে। খাগড়াছড়ি শহরের মেঘ আর বৃষ্টিসমেত এক অনন্য দৃশ্য ফুটে উঠছিল আমাদের চোখের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে হালকা হেঁটে তারেং পাহাড়ের চূড়ায় আর্মির হেলিপ্যাড এ পৌঁছলাম আমরা। এ যেন এক অনন্য দৃশ্য, দূরের ওই নীল-সাদা মেঘগুলি ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের আপন গতিতে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমরা সেই মুহূর্তগুলি মুঠোফোনে বন্দী করে নিলাম। হঠাৎ মেঘ হেলিপ্যাডের দিকে ধেয়ে এলো আর এক পশলা বৃষ্টি…বৃষ্টি নামতে না নামতেই সবাই পড়িমরি করে ছুটল গাড়ির দিকে।

তারেং থেকে আবার গাড়িতে চড়ে রওনা দিলাম হর্টিকালচার পার্ক এর পানে। গাড়ি থামতেই চোখে পড়ল বিশাল এক ফটকে লিখা -“খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক”। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম সবাই, পার্কটা মোটামুটি ফাঁকা আর নিরিবিলিই ছিল…অন্যান্য স্পট গুলোর মতো অতটা ভিড় ছিলনা। প্রথমেই একে একে ছবি তুলে নিলাম ঝুলন্ত ব্রিজে, এরপর ব্রিজ পার হয়ে হেঁটে হেঁটে দেখলাম পুরো পার্ক। আশেপাশে রঙবেরঙের ফুলগাছের সমাহার, বাহারি রঙের ফুলে পার্কটা সত্যিই মোহনীয় হয়ে উঠেছে। হেঁটে হেঁটে আমরা কয়েকজন চলে আসলাম লাভ পয়েন্টে, যুগলদের ছবি তোলার জন্য এই পয়েন্ট। কি আর করার, এসেই যখন পড়েছি আমরা ক’জন সিংগেল পোলাপান কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। উপর থেকে পার্কের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেছে, আর নিচেই তৈরী করা হয়েছে ছোট পুলের মতো জলাধার।  


 

পার্ক থেকে সবাই বেরিয়ে গ্রুপ ফটো নেয়া হলো, এরপর আবার চান্দের গাড়িতে চড়ে খাগড়াছড়ি বাজার, বাজারের একটা রেস্টুরেন্টে নেমে আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। আবার যাত্রা শুরু বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে, বিকেল তিনটার স্কট ধরতে হবে, নয়তো নাকি আর্মি সাজেক যেতে দিবে না…আবার খাগড়াছড়ি ফিরে আসতে হবে। হাতে আছে প্রায় আড়াই ঘন্টার মতো, সাঁই সাঁই করে চান্দের গাড়ি ছুটে চলছে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে। পার্বত্য অঞ্চলগুলো ভ্রমণের এই একটাই আকর্ষণ, তা হচ্ছে চান্দের গাড়ির ছাদে চড়ে প্রকৃতি দেখা। ঘন্টাখানেক চলতে চলতে আমরা দিঘীনালা পার হয়ে এলাম। এরপর গাড়ির ছাদ থেকে নেমে আমরা ভেতরে ঢুকে গেলাম, আর্মির সামনে পড়লে আরেক বিপত্তি বাঁধবে। আরো প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা…রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। বৃষ্টিতে আর নিয়মিত ভারী যানবাহনের চলাচলে রাস্তার খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বাঘাইহাট ক্যাম্পের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা, আর মিনিট বিশেক এর পথ। ঠিক তখনই বাঁধল প্রথম বিপত্তি, লম্বা গাড়ির জ্যাম… গর্তে ভরা ঢালু আর পিচ্ছিল রাস্তা পেরিয়ে সামনে যেতে বেগ পেতে হচ্ছিল সামনের গাড়িগুলোর। হঠাৎ গাড়িতে এক তীব্র গর্জন নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল আমাদের ড্রাইভার নূর আলম। কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ির ছাদে বাড়ি খেলাম, মাথাটা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছিল। নিজেকে সামলিয়ে নিতেই আবিষ্কার করলাম আমরা ঢালু রাস্তা বেয়ে উপরে উঠে গেছি, গাড়িচালক নূর আলমের পারফর্মেন্স দেখে সবাই তাকে “পাইলট” উপাধি দিল। এরপর মিনিট পাঁচেক সামনে এগিয়ে যেতেই আমাদের অন্য গ্রুপ থেকে ফোন এলো, তাদের গাড়ির চাকা সেই ঢালু রাস্তার পাশের নালায় আটকে গেছে। কিছুতেই উঠানো যাচ্ছেনা, আমাদের সাহায্য প্রয়োজন। ইতোমধ্যেই তিনটা বেজে গেছে প্রায়, স্কট সর্বোচ্চ মিনিট দশেক অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে গিয়ে না পৌঁছলে এতদূর আসাটাই বৃথা হবে। সবাই দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেল, কেউ বলছিল সামনে এগিয়ে যেতে…কেউ বলছিল পেছনে গিয়ে ওদের সাহায্য করতে। আর আমাদের ট্যুর এডমিন রুপম ভাইও যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন এর একটা সমাধান বের করতে। শেষমেশ আমাদের পাইলট নূর আলম ভাই আরো এক অনন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে বিষ্মিত করলেন, গাড়ি ব্যাক দিলেন তাদের সাহায্য করার জন্যে।

 

স্পটে পৌঁছে দেখি গাড়ির পেছনের চাকা খুব বাজেভাবে আটকে গেছে, কিছুতেই উপরে উঠছে না। আমাদের গাড়ির সাথে দড়ি বেঁধে টানা হলো, আর আমরা কয়েকজন নালার পাশ থেকে গাড়ি ঠেলে উপরে তোলার চেষ্টা করছিলাম। আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে গাড়ি টেনেটুনে নালা থেকে উপরে তোলা গেল, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। সাড়ে তিনটা বেজে গেছে, এতক্ষণে স্কট নিশ্চিত ছেড়ে চলে গেছে। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, আমরা যখন আর্মি ক্যাম্প এসে পৌঁছলাম তখন দেখি একটাও গাড়ি নেই। ধীরে ধীরে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, কি আজব ব্যাপার…আর্মি কিছুই বলল না। আমরা ক্যাম্প ফেলে সামনে এগিয়ে গেলাম, রাস্তার মারাত্মক অবস্থা ও নিয়মিত যাতায়াতের কারণে আর্মি হয়তো স্কট মিস করলে ফেরত পাঠানোর নীতিমালা শিথীল করেছে। যাক, বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম আমরা সবাই…আলহামদুলিল্লাহ। কিছুদূর যেতে সামনে পড়ল একটা ব্রিজ, ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে কাসালং নদী। আরো কিছুদূর গিয়ে একটা পুলিশ ক্যাম্প সামনে পড়ল, চেকপোস্টে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা আমাদের বিলম্বের কারণ জানালাম। আমাদের পেছনে থাকা অন্য গ্রুপটি এলে পরে আবার সামনে এগিয়ে চললাম। আরেকটি আর্মি চেকপোস্ট পেরিয়ে যাবার পরই গাড়ি থামিয়ে সবাই আবার চান্দের গাড়ির ছাদে উঠে পড়লাম। সন্ধ্যা নামতে আরো ঘন্টা খানেক বাকি, আমাদের গাড়ি পাহাড়ি পথ বেয়ে সামনে এগিয়ে চলছে। দূরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দেখলাম তুলার মতো মেঘ জমাট বেঁধে আছে, এ যেন এক অপূর্ব দৃশ্য। যতোই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম পাহাড় আর সাদা মেঘের মনোরম দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছিলাম আর বলতে বাধ্য হচ্ছিলাম…সুবহান-আল্লাহ…আল্লাহু-আকবর। এমন মনোরম দৃশ্য সমসময় চোখে পড়েনা, বৃষ্টির কারণে প্রচুর মেঘলা ছিল আকাশ। বলতে না বলতেই একগুচ্ছ মেঘ এগিয়ে এলো আমাদের উপর আর শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। গাড়ির ছাদের উপরে থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আর সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টি উপভোগ করছিলাম…এ দৃশ্য কেবল দুচোখে উপভোগ করা যায়, ক্যামেরায় কিংবা মুঠোফোনে এ দৃশ্য ধারণ করার মতো নয়। আমাদের গাড়ি এবার খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল আমরা সাজেকের রুইলুই পাড়ার খুব কাছেই এসে পড়েছি। বৃষ্টি থেমে গেছে…বলতে না বলতেই আমরা ঢুকে পড়লাম মেঘের রাজ্যে, আশেপাশে ধোঁয়ার মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে… ঈষৎ ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে শরীরে। মেঘেরও আলাদা এক ঘ্রাণ আছে, এ ঘ্রাণ আমি আগে কোথাও পাইনি…তাই লিখে প্রকাশ করতে পারছিনা।

 

সাজেকে ঢুকেই চেকপোস্টের আগে আমরা আবার গাড়ির ছাদ থেকে নেমে ভেতরে ঢুকে পড়লাম, সাজেকের ধোঁয়ার মতো মেঘে ঢাকা রাস্তা গড়িয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। গাড়ি এসে থামলো “দার্জিলিং রিসোর্ট” এর সামনে। গাড়ি থেকে নেমে আমরা রিসোর্টে চেক-ইন করে আমাদের বুক করে রাখা রুমগুলো বুঝে নিলাম। মীর, আমি, আরশাদ ও আরেকজন ভাইসহ আমরা উঠলাম দোতলার ২০৭ নম্বর রুমে। রুপম ভাই আমাদের ডিনার, নাস্তা, আগামীকালের ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের কুপন বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। গোসল আর নামাজ শেষ করে আশপাশটা ঘুরে দেখলাম, রাতের খাবার আটটায়…জুম্ববি রেস্টুরেন্ট এ অর্ডার করা ছিল। গল্প-আড্ডা-আর ঘোরাঘুরি শেষে সবাই মিলে রাতের খাবার খেতে চললাম, এখানকার অধিকাংশ খাবারে শুধু বাশ আর বাশ। ব্যাম্বো চিকেন, ব্যাম্বো বিরিয়ানি থেকে শুরু করে বাঁশ কোড়ল তো আছেই। ভাতের সাথে ব্যাম্বো চিকেন আর বাঁশ কোড়ল এর সবজি ও ডাল দিয়ে আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে একটু হাঁটাহাঁটি করে সবাই মিলে চললাম হেলিপ্যাড। অসংখ্য পর্যটক ভিড় করেছে এই হেলিপ্যাডে, যেন ছোটখাটো এক নিউ মার্কেট। আরেকটা ট্যুরিং গ্রুপ ফানুস উড়ানোর আয়োজন করছিল, যদিও প্রচন্ড বাতাসে তাদের ফানুস উড়ানোর প্রচেষ্টা ব্যার্থ হয়। আমরা কয়েজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম আর কথার প্রসঙ্গে আবিষ্কার করলাম সৈকত ভাই কে। প্রেম, ভালোবাসা ও নারী-পুরুষের প্রতি সম্মান প্রসঙ্গে মজার এক বক্তব্য রাখলেন ঝানু সৈকত ভাই…আর আবিষ্কার করলেন চিঠির। একে একে সাক্ষাতকারও নিলেন তিনি। সিনিয়র ট্রাভেলার মাসুদ ভাই তো চিঠির শানে নুজুল বুঝতে না পেরে কাঁচুমাচু হয়ে ছিলেন, পরে যখন বুঝতে পারলেন…তার ফেলে আসা যুবক বয়সের কথা মনে পড়ে যায় আর আবেগে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। সৈকত ভাই এর আলোচনা শেষে প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- “চিঠি ধরাতে হবে, মানে চিঠি দিতে হবে…নয়তো এভাবে সিঙ্গেল থেকে যাবেন।”

 

আড্ডার মাঝেই হঠাৎ করে নামল বৃষ্টি, হেলিপ্যাড ছেড়ে সবাই দিলো ভোঁ দৌড়…এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হেলিপ্যাড থেকে এমন দৌড় লাগাচ্ছি। দৌড়ে গিয়ে সবাই এক রেস্টুরেন্ট এ আশ্রয় নিলাম, চা-কফি খেয়ে বৃষ্টি থামলে পরে আবার সবাই রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টে এসে আরেক দফা আড্ডা শেষে এগারোটার দিকে সবাই চললাম রেস্টুরেন্ট এর দিকে, বার্বিকিউ খেতে। খাওয়া-দাওয়ার আগে পুরো সাজেক মাতিয়ে তুলল শেয়ার বেসিস টিমের ছেলেপিলেরা, রেস্টুরেন্ট এর সামনে জমে গেল নাচ-গানের আসর…আরো দু-তিনটি গ্রুপ থেকে ছেলেপিলেরা এসে যোগ দিল। বাবার দরবারের সামনে সব পাগলের খেলা জমে উঠল। নাচ-গানের আসর শেষে শেয়ার বেসিস টিমের লটারী অনুষ্ঠিত হলো আর সবাইকে বিভিন্ন মজার মজার পুরস্কার দেয়া হলো। আমি পেলাম সাবান, কটন আর দাঁত মাজার ব্রাশ। অন্যান্য মজার মজার পুরস্কারের মধ্যে ছিল ফিডার, হারপিক, টুথপেস্ট, সাবান, শ্যাম্পু, সরিষার তেল ইত্যাদি। 

 

লটারী আর পুরস্কার বিতরণী শেষে আমরা পরটা দিয়ে বার্বিকিউ খেয়ে আবার রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টে এসে যে যার মতো গল্প-আড্ডা দিলো। এই ট্যুরের নাম দেয়া হয়েছিল লুসাই নদী ভ্রমণ, অথচ আমার জানামতে এখানে লুসাই নামের কোন নদী নেই। ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে কর্ণফুলীর উৎপত্তি, আর সাজেক থেকে সেই পাহাড়ের সারি চোখে পড়ে। পরে জানলাম, রাতে মেঘগুলো পাহাড়ের সারির সামনে অনেকটা নদীর মতো দেখায়…তাই মজা করে নাম দেয়া লুসাই নদী। ভোর পাঁচটায় উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আমরা কয়েকজন চা খেয়ে বের হলাম হেলিপ্যাডের দিকে, আবারো পর্যটকের ভিড়। এদিক ওদিক ঘুরে কিছু ছবি নিয়ে আবার ফিরে এলাম রিসোর্টে, সকাল সাতটায় টিমের বাকি সবার সাথে রেস্টুরেন্টে খিচুড়ি দিয়ে নাস্তা সেরে চললাম কংলাক পাহাড়ের দিকে। পাহাড়ের কিছু অংশ ট্রেকিং করে উঠতে হয়, যেতে যেতে সামনে পড়ল দুয়েকটি টং। বাঁশের পাত্রে চা খেলাম সবাই, এরপর হাঁটতে হাঁটতে কংলাক পাড়া…লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত সাজেকের সর্বশেষ পাড়া। আর কংলাক পাহাড়ের চূড়া…সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া, মেঘ খুব কাছ থেকে দেখা যায় এখানে। কংলাক পাহাড়ে মেঘ দেখা শেষে বেশ ক্ষানিক্ষণ একাকি এককোণে বসে প্রকৃতির বিশালতা উপভোগ করলাম আর ক্রমেই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। ফেরার পথে পাহাড়ের চূড়ায় কিছু ছবি মুঠোফোনে বন্দী করে নিলাম।

 




আসার পথে গাড়ী কাদামাটি বেয়ে উঠতে পারছিল না, আবার পড়লাম সবাই বিপদে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় টানা আর ঠেলায় পাইলট নূর আলম ভাই গাড়ি উপরে তুললেন। সাজেক জিরো পয়েন্ট এসেই গাড়ি থেকে সবাই পড়িমরি করে নেমে একে একে ছবি তুলে নিলো। রিসোর্টে ফিরে একটা রুমে সবাই ব্যাগপত্র রেখে বাকি রুমগুলো ছেড়ে দিলাম, বিকাল তিনটার স্কটে রওনা দেব খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। বিষন্ন মন নিয়ে রিসোর্টের বারান্দায় চেয়ারে বসে দূরের পাহাড়ে মেঘের খেলা দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। মীরের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় একটা বাজে, কয়েকজন মিলে গেলাম হেলিপ্যাডের কাছের মসজিদে। নামাজ শেষ করে যখন ফিরে আসছিলাম দূরের সাদা-কালো মেঘ আর বৃষ্টি চোখে পড়ল, দুয়েক মিনিট বাদেই মেঘ চলে এলো আমাদের দিকে… আবারো বৃষ্টি, ছুটে গিয়ে বসলাম লুসাই হেরিটেজ পার্কের এক চায়ের দোকানে। বাঁশের বেঞ্চিতে বসে ঝুম বৃষ্টি উপভোগ করছিলাম আর পাশে থাকা এক আগন্তুকের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আবছার ভাই আনসার বাহীনি থেকে অবসর নিয়ে কাঠের ব্যাবসা করছেন, দীর্ঘ সাত বছর যাবত আছে এই সাজেকে। এলাকা সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন তিনি। শান্তি বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তাঁর গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন, আনসার বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন বেশ কয়েকবার এই দুর্ধর্ষ বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকে। একবার তো গুলির শব্দে প্রায় বধির হয়ে যাবার মতো অবস্থা। এই শান্তি বাহিনী যে কত-শত মানুষ,পর্যটক আর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রাণ নিয়েছে তার কোন হিসাব নাই। লুসাই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার কিছু চিত্রও পরিলক্ষিত হলো, উপজাতি মেয়েরা পিঠে বাধা ঝুড়িতে করে পানি বোতল নিয়ে আসছে। সাজেকে পানির খুব সংকট, অনেক নিচ থেকে ঝর্নার পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হয়।

 

বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ না দেখে ভিজে ভিজে রিসোর্টে এলাম, এরপর ব্যাগপত্র আর ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে। বাঁশ কোড়ল, দেশী মুরগি, ভর্তা আর ডাল দিয়ে লাঞ্চ শেষ করে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। এরই মধ্যে বাঁধল আরেক বিপত্তি, অন্য গ্রুপের গাড়ির অবস্থা নাজেহাল হওয়ায় তারা গাড়ি পরিবর্তন করা ছাড়া যাবেনা। এদিকে আমাদের গ্রুপের কেউ ওই গাড়িতে যাবে না। অনেক বাকবিতণ্ডা শেষে সৈকত ভাইয়ের পরামর্শে আমরা আমাদের গাড়িতে উঠে পড়লাম। উপায়ন্তর না পেয়ে ওদেরও অন্য গাড়িতে আসতে হলো। আমরা খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, সাজেকে তখন ঝুম বৃষ্টি। ফেরার পথেও আমাদের সময়ের সাথে পাল্লা দিতে হলো, সন্ধ্যা সাতটার বাস ধরতে হবে তাই। পাইলট নূর আলম ভাইয়ের রাফ ড্রাইভিং এ দু-তিনজন বমি করা শুরু করল…আরেকজন তো মাথায় বাড়ি খেয়ে অবস্থা খারাপ। পুরো জার্নিতে এই চান্দের গাড়ির ছাদে ভ্রমণটাই স্পেশাল, তাই শেষবারের মতো ছাদে উঠে পড়লাম। রাতের আঁধারে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে হেডলাইট জ্বেলে জ্বেলে এগিয়ে চলছিল আমাদের গাড়ি। ঠিক সাতটার পাঁচ মিনিট আগে এসে আমরা পৌঁছলাম খাগড়াছড়ি শান্তি পরিবহন বাস কাউন্টারে।

 


বাসে উঠেই আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছিল, মানিকছড়ি পর্যন্ত দেড় ঘন্টার পথ পুরো শেয়ার বেসিস টিম যে যার মতো রিলাক্সে ছিল। পাহাড়ে রাতের আকাশে চাঁদের জোছনা উপভোগ করতে করতে বাসভ্রমণ…আহ… সে এক অপার অনুভূতি। মানিকছড়িতে যাত্রাবিরতির পর সৈকত ভাই আবার তার চিঠি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। পেছন থেকে আরেকটা ট্রাভেল গ্রুপের মেয়েদের গানের গলা ভেসে আসছিল, আমরাও তাদের সাথে শুরু করে দিলাম গানের কলি। অন্য ট্রাভেল গ্রুপের ছেলেমেয়েগুলো ছিল একেকটা হিন্দি গানের ক্যাসেট, আমাদের বাংলা গানের পুঁজি নিয়ে তাদের সাথে টেক্কা দিতে কষ্ট হচ্ছিল, যদিও সৈকত ভাই একরকম একাই লড়ে যাচ্ছিল আর বারবার ওদের “ন”-এর গর্তে ফেলছিল। যেন ক্ষণিকের জন্যে ফিরে গেলাম স্কুল-কলেজ আর ভার্সিটির ফেলে আসা দিনগুলোতে…যেন কোন এক পিকনিকের বাস। রাত এগারোটার দিকে আমরা চলে আসলাম অক্সিজেন বাস কাউন্টার, গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে বিদায় জানিয়ে ঘরের পথে পা বাড়ালাম।

 

#পুনশ্চঃ রাতেই ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম আমি একের পর এক বিড়ি টানছি। আসলে সত্য বলতে কি, আশেপাশে সব কয়টা ছেলেপিলে এতো বেশি বিড়ি টানছিল যে তাদের বিড়ির ধোঁয়ায় ছোট ছোট মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে নিজেকে দমিয়ে রেখেছি, তাই এখন স্বপ্নে বিড়ি টানছি। হঠাৎ সেই নীল পরী বিড়ির সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া থেকে বেরিয়ে এসে আমায় বললো – “আমাকে দিবা এক টান?”

ধুপপানি অভিযান


 

“Traveling—it leaves you speechless, then turns you into a storyteller” ইতিহাসের বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার এই বিখ্যাত উক্তির মধ্যেই ফুটে উঠেছে সকল ভ্রমণপিপাসু মনের এক অপার পরিতৃপ্তি। কালের বিবর্তনে ভ্রমণকাহিনী লেখার স্থান দখল করে নিয়েছে ক্যামেরায় তোলা ছবি। কিন্তু এই লেখালেখির মধ্যে যে কি আনন্দ তা একমাত্র প্রকৃত লেখক, পাঠক আর তাদের অনুসরণকারীরাই বুঝেন। ট্যুরের আগেই জানিয়েছিলাম ফিরে এসে বিস্তারিত গল্প হবে, আর তাই সময় সুযোগ বুঝে ধুপপানি ট্যুর নিয়ে লিখে ফেললাম। এখন অবশ্য লোকের হাতে এত লম্বা লেখা পড়ার সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার? যদি ধৈর্য্য ধরে পুরো গল্পটা পড়তে পারেন আশা করি নিরাশ হবেন না। গল্পের শুরুটা অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে, বহুদিন ধরেই এমন কোন গ্রুপের খোঁজে ছিলাম যাদের সাথে নিশ্চিন্তে ট্যুর দেয়া যায়। বন্ধু নিশাতের মাধ্যমে  Share Basis Tour গ্রুপের সাথে পরিচয় যারা শেয়ার বেসিসে (যা খরচ হবে ট্যুরের সবাই সমানভাবে) ট্যুর আয়োজন করে থাকে। প্রথমে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছিল না, এতো কম খরচে এরা ট্যুর আয়োজন করে কিভাবে? এখন সব জলের মতো পরিষ্কার, সবকিছুর মূলে আন্তরিকতা…যা খুব কম ট্রাভেল গ্রুপেই দেখা যায়। 

 

#প্রথম_দিন

এবার মূল গল্পে যাওয়া যাক। শেয়ার বেসিস গ্রুপের ধুপপানি ট্যুর দেখেই কাপ্তাই লেক ও আশেপাশের উপজাতিদের জীবনযাত্রা নিজ চোখে দেখে আসার ইচ্ছেটা পুনরায় জেগে উঠে। তাড়াতাড়ি এডভান্স পে করে সিট বুক করে নিলাম কেননা এই ট্যুরের টিম সাইজ ছিল ১৫-১৭ জন। একটা পুরো ট্রলার ভাড়া করা হচ্ছে দুদিনের জন্যে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ৩০ জনের বোটে ১৫ জন আরকি। ২৯ তারিখ শনিবার ভোর সাড়ে চারটায় ফজরের সালাত আদায় করেই আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, মিটিং স্পট…রাস্তার মাথা…ভোর ৬ টা। সিএনজি নিয়ে ভোর ছটার বেশ কিছুক্ষণ আগেই রাস্তার মাত্রা পৌঁছে দেখি ট্যুর এডমিন রুপম ভাই, সিনিয়র ট্রাভেলার শাহজাহান ভাই ও বেশ কয়েকজন অপেক্ষা করছে। ছটা বাজতেই একে একে লিচুবাগান এর সিএনজি ধরলাম, এরপর লিচুবাগান থেকে কাপ্তাই পৌছালাম। ঘড়িতে তখন আটটা, কাপ্তাই জেটি ঘাটের বাজার থেকে সকালের নাস্তা, আপেল, পানি, বন-কলা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আমাদের ভাড়া করা বোটে উঠলাম, আজকের দিনেই মুপ্পোছড়া আর ন-কাটা ঝর্না দুটো দেখার পরিকল্পনা আছে। আর তাই বোট সরাসরি আমাদের নিয়ে যাবে ঝর্না দুটির উদ্দেশ্যে। সবাই উঠে বসতেই আমাদের বোটের মাঝি ইউসুপ ভাই ইঞ্জিন চালু করলেন, ইঞ্জিনের এই শব্দ প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তিকর লাগলেও একটা সময় গিয়ে এর সাথে মানিয়ে নিয়েছে সকলেই। এমনকি দ্বিতীয় দিন ইঞ্জিনের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি নিজেই। আমাদের বোট যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল কাপ্তাই লেকের মোহনীয় সৌন্দর্যে ততোই মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল কাপ্তাই বাঁধের ১৬ টি গেট বিশিষ্ট স্পিলওয়ে, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে যে বাঁধের সৃষ্টি আর জলাধার হিসেবে দেশের একমাত্র কৃত্তিম হ্রদ। লেকের নীল স্বচ্ছ জল কেটে কেটে বোট যতই এগিয়ে যাচ্ছিল সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টির সৌন্দর্যে বারংবার মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আধ ঘন্টার পথ পাড়ি দেয়ার পর আমরা গাছকাটা আর্মি ক্যাম্পের সামনে এসে পৌঁছলাম, এডমিন রুপম ভাই সকলের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি আর্মি ক্যাম্পে জমা দিয়ে আমাদের গ্রুপ ছবি তুলে নেয়ার পর আমরা এন্ট্রি পারমিশন পাই। সেনা সদস্য থেকে জানতে পারলাম এখানে রবি আর টেলিটক ছাড়া আর কোন সিমের নেটওয়ার্ক নাই, সাথে সাথে আমার মাথায় হাত…কেননা আমার সিম দুটো হচ্ছে গ্রামীণ আর বাংলালিংক। কি আর করার, বোটে যেতে যেতে খানিক বাদেই নেটওয়ার্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম দুদিনের জন্যে।

 

প্রথম আর্মি ক্যাম্প পেরিয়ে আমাদের বোট সামনের দিকে এগিয়ে চলছিল....ইতোমধ্যে আবিষ্কার করলাম সবাই আমরা বোটের চালার উপর, আর তাই সকালের নাস্তাটা এখানেই হয়ে গেলে মন্দ হয় না। নিচ থেকে পরটা আর ভাজির প্যাকেট উপরে আনা হলো। আশে পাশে পাহাড়ে আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বোটের উপর সকালের নাস্তা, আহ...সে এক অনন্য তৃপ্তি। এই এলাকার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই জলপথ, আর তাই আশে পাশে চোখে পড়ছিল ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন সাইজের নৌকা আর ট্রলার। ওই দূরে সাদা বক লেকের পানিতে মাছ শিকারে ব্যাস্ত। আশে পাশের টারশিয়ারি যুগের ছোট বড় পাহাড়গুলো মাথা উঁচু করে যেন বলছে- "হ্যাঁ ভাই, আমাদের জন্ম হিমালয় গঠনের সময়কালেই"।

 


ঘন্টাখানেক বাদেই আমরা বিলাইছড়ির সেনা সদর ক্যাম্পের ঘাটে পৌঁছলাম, এই ক্যাম্পেও NID জমা দিয়ে আজকের দিনের মুপ্পছড়া ও নকাটা ঝর্না ট্রেইলের অনুমতি নিতে হলো।

 

আর্মি ক্যাম্প থেকে বোট যাত্রা শুরু করল আঁকাবাকা খাল হয়ে, এবারে লেকের পানির পরিমাণ কম হওয়ায় লেকের শাখা-উপশাখাগুলোর পানি শুকিয়ে খাল হয়ে গেছে। প্রায় দু ঘন্টা বোট জার্নির পর বাঙ্গালকাটা ঘাটে এসে ভিড়ল আমাদের তরী। আমি আর শাহজাহান ভাই সবার আগেই নেমে পড়লাম বোট থেকে, যত দ্রুত ট্রেইল শুরু করা যায়। কিন্তু বাকি সবার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আর গাইড ভাড়া করে সাথে নিতে নিতে প্রায় মিনিট বিশেকের মতো অতিবাহিত হলো। আমাদের গাইড সুমন চাকমা একটা ৫ লিটারের পানির বোতল নিয়ে তরতর করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। মাথার উপর সূর্য যেন মগজ থেকে সব জল শুষে নিচ্ছে, মিনিট বিশেক ট্রেইল করতে না করতেই মোটামুটি হাপিয়ে গেলাম। আমরা ৫-৬ জনের দল বাকি সবার থেকে অনেক এগিয়ে এসেছি, তাই খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে জল খেয়ে নিলাম। হাতে চাপা এক ধরনের পাহাড়ি টিউবওয়েল দেখলাম যা সচরাচর সমতলে দেখিনি কখনো, সুমন দাদার ভাষায় এটা ফ্রিজের পানি। আসলেই...এতোটা ঠান্ডা পানির জলে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। বাকি সবার দেখা মিলতেই আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

 

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে বেশ কিছু ঝিরিপথের দেখা মিলল। দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে এরকম ঝিরিপথ পা ভেজানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের নয়। হাটতে হাটতে আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক এর পথ অতিক্রম করলাম, চোখে পড়ল ছোট একটি ছরা। আমাদের মতো আরো বেশ কয়েকটি টিমের আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছিল, আর তাই পর্যটকদের ভীড়ে প্রকৃতির সান্যিধ্য ঠিকঠাক উপভোগ করতে পারছিলাম না। আরো কিছুদূর যেতে না যেতেই বিপরীত দিক থেকে ফেরত আসা পর্যটকদের মুখে আফসোস দেখতে পাচ্ছিলাম। এই শুকিয়ে যাওয়া ঝর্না দেখতে এতদূর আসাতে এরা কেউই সন্তুষ্ট নয়। সে যাই হোক, এসেছি যখন পানি কম হলেও দেখে যেতেই হবে...কেননা আমি মনে করি পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্নাগুলো আপনার প্রেয়সীর মতোই, যা  চিরযৌবনা থাকবে না...তবুও ভালবেসে যেতে হবে নিরন্তর। নির্জন নিরিবিলি কয়েকটি ক্যাসকেড এর ভিডিও ধারণ করে নিলাম মুঠোফোনের ক্যামেরায়। এরপরই দেখা মিলই সেই প্রতিক্ষিত মুপ্পোছড়া ঝর্নার, ঝর্নার পানি কম থাকলেও এতদূর পথ ট্রেইল করে এসে এই ঠান্ডা পানিতে গা ভেজানোর মতো আনন্দের আর কিছুই হয়না। অতঃপর বেশ খানিক্ষণ টিমের বাকি সদস্যরা সহ ঝর্নার পানিতে গোসল করে ফিরতি পথে যাত্রা শুরু করলাম নকাটা ঝর্নার উদ্দেশ্যে।

 

ন-কাটা ঝর্নার নামার পথটা বেশ পিচ্ছিল ছিল, ট্রেকিং স্যান্ডেল আর হাতে থাকা লাঠির সহায়তায় অবশ্য তেমন বেগ পেতে হয়নি। উপর থেকে নেমে আসা পানির স্রোত বিশাল খোপ খোপ কাটা পাথরের উপর আছড়ে পড়ছে, বাংলা নয় এর মতো দেখতে বলেই হয়তো এই ঝর্নার নাম ন-কাটা। ঝর্নার পানিতে গা ভিজিয়ে আর মুঠোফোনে ছবি ধারণ করে ফেরার পথ ধরলাম আমরা। বোটে যখন ফিরে আসি তখন প্রায় দুপুর দুইটা। এখন বিলাইছড়ি গিয়ে আগে থেকেই বুক করে রাখা কটেজে উঠব। প্রায় আধঘন্টার বোট জার্নির পর আমরা বিলাইছড়ি ঘাটে এসে নামলাম, ভাতঘর হোটেলে জুমের চালের ভাত, আলুভর্তা আর মুরগি দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে উঠলাম “স্বপ্ন বিলাস” বোর্ডিং এ। ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বোটে করে আশপাশটা ঘুরে দেখা যাবে। ঠিক এই পড়ন্ত বিকেলে প্রকৃতি যেন আমাদের তার সকল রূপ-রস ঢেলে দিয়েছিল…শেষ বিকেলের দিকে দীঘলছড়ি সেতু পেরিয়ে কিছুটা সামনে যেতেই উপভোগ করছিলাম ওই দূরে পাহাড়ের পেছনে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। খানিক বাদে আমরা বোটের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটাতে। মাগরিবের সময় হলে বোটের ছাদের একপাশে আমরা কয়েকজন সালাত আদায় করে নিলাম আর আল্লাহ্‌র এই অশেষ নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করলাম। অন্ধকার নামতে নামতে বোটের উপর বসল আড্ডার আসর, ওই দূরে নলখাগড়ার বন…মৃদুমন্দ বাতাস আর এই সান্ধ্যকালীন আড্ডা এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। সেই সোনালী মুহূর্তগুলি আবার কখনো ফিরে পাবো কিনা জানিনা, আড্ডার এক পর্যায়ে আমরা কলা, বন, জাম্বুরা, পেয়ারা আর আপেল দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। এরপর শুরু হলো গানের আসর…ঘন্টাখানেক পরে আমরা আবার রওনা দিলাম বিলাইছড়ি ঘাটের উদ্দেশ্যে। 

 


লেকের আইড় মাছ, আলু ভর্তা, ডাল আর জুমের চালে হলো রাতের খাবার। খাবার শেষ করে কিছু সময় কাটালাম বোটের উপর…আমাদের সহকারী মাঝি বিজয় চাকমার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল এক পাহাড়ী তরুণীকে, দেখেছিল বিয়ের স্বপ্ন পাঁচটি বছর ধরে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডন, তরুণীর পরিবার থেকে অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়ে যায়…যেখানে সে টিকতে পারেনি বেশিদিন। প্রচন্ড নির্যাতন আর মানসিক অশান্তিতে অসুস্থ হয়ে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সেই থেকে বিজয় চাকমা হাতে তুলে নিয়েছে পাহাড়ি মদের বোতল। এখন তার জনা-পাঁচেক বান্ধবী, কিন্তু নেই সেই প্রথম প্রেমের মতো অনুভূতি। খুব ছোটবেলায় সে এক রাতে কোষা নৌকা নিয়ে যখন লেকের পানিতে মাছ ধরছিল, শিলা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে নৌকাকে উল্টো করে আশ্রয় নিয়েছিল নৌকার নিচে, আজ নিজের জীবনের এই করাল গ্রাসে আশ্রয় নিতে পারছে না কোথাও আমাদের সহকারী মাঝি বিজয় চাকমা।  

 

#দ্বিতীয়_দিন

ভোর পাঁচটায় উঠে ফজরের সালাত আদায় করে নিলাম। ছটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য ধূপপানির উদ্দেশ্যে। ছটার মধ্যেই আমরা সবাই তৈরী হয়ে হোটেলে অর্ডার করে রাখা বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে বোটে উঠলাম। অসুস্থতার জন্যে আমাদের একজন হোটেলেই থেকে গেল। ঠিক ভোর সাড়ে ছটার দিকে বোট ছেড়ে দিল। কিছুদূর গিয়ে আমরা সেনা সদর ক্যাম্পে NID জমা দিয়ে ধূপপানি ট্রেইল এর অনুমতি নিতে গেলাম। আর্মি ক্যাম্প থেকে বোট যাত্রা করল উলুছড়ির উদ্দেশ্যে, প্রায় ঘন্টা দেড়েক এর পথ। সকাল সকাল লেকের অপরূপ প্রকৃতি দেখে মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল-“এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে না’ক তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।” সাথে আনা বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে দেখলাম, শুটকি ভর্তা দিয়ে মোটা জুম চালে মুরগির বিরিয়ানি। এখানের রীতিনীতি নাকি এমনই, মোটা চালেই বিরিয়ানি হয়। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর রোদের তেজে বোটের উপর বসতে কষ্ট হচ্ছিল, আবার গতদিনের ক্লান্তিতে প্রচুর ঘুম পাচ্ছিল। বোটের গলুই এর কাছের একটু ঘুমিয়ে নিলাম, পাশেই ইঞ্জিনের কর্কট শব্দ। যদিও ঘুমের কাছে এই শব্দ কিছুই না। হঠাৎ এডমিন রুপম ভাইয়ের হাঁকডাকে ঘুম ভাঙল, একটু দূরেই দেখি আরেকটা আর্মি ক্যাম্প। এই “অলিখিয়াং আর্মি ক্যাম্প” আমাদের যাত্রাপথের সর্বশেষ আর্মি ক্যাম্প। যথারীতি নিয়মকাণুন মেনে অনুমতি নিয়ে বোট ছাড়ল আর দশ মিনিট পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম উলুছড়ি ঘাটে।

 

ঘাটে নেমেই গাইড নিলাম সাথে আমরা, আজ আমাদের গাইড মিলন দাদা। এই এলাকায় সব তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতিদের বসবাস, আমাদের গাইড মিলন দাদা খুব মিশুক আর বড় মনের মানুষ ছিলেন। আসলে পাহাড়ী এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা খুবই সাদাসিদে, আমাদের মতো এতোটা কূটকৌশল নিয়ে চলেনা তারা। এতো দুর্গম এলাকায় হাজারো নাগরিক সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত থাকার পরও তাদের এতটুকুও অভিযোগ নেই। দুটো খেয়ে পড়ে নিজেদের মতো বেঁচে থাকার মধ্যেই তাদের প্রকৃত সুখ নিহিত, আর আমাদের শহুরে জীবনে যেন চাহিদার শেষ নেই।

 

আমার হাতে থাকা ফিট ব্যান্ড এর Walking Workout চালু করে দিলাম, পাহাড়ি ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা দুএকটি জুম ক্ষেত পেরোলাম। আজকের ট্রেকিং খুব কষ্টকর হচ্ছে, পথে কোন ঝিরি নেই, মাথার উপর সূর্যের তেজ বেড়েই চলেছে। চলতে চলতে প্রায় মিনিট বিশেক পর একটা ঝিরির সন্ধান পেলাম। আমাদের গাইড মিলন দাদা বললেন এই ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে গেলে হাতিমারা ঝর্না পড়বে, কিন্তু এই হাতিমারা ঝর্নায় যাবার পথ খুব কঠিন এবং মৃত্যুঝুঁকি আছে বলে এই পথে ট্রেকিং নিষিদ্ধ। ঝিরি থেকে উঠে আমরা একটা পাহাড়ের পথ ধরলাম, এরকম উঁচুনিচু আরো তিনটে পাহাড় পেরোতে হবে। প্রথম পাহাড়টি পেরিয়ে যেতেই মিলন দাদা পাহাড়ী ডুমুর ফল পেড়ে খাওয়ালেন আমাদের। এই ঘন জঙ্গলে এসে পাহাড়ি ফল খেয়ে কিছুটা তৃপ্তি অনুভব হচ্ছিল, অথচ প্রচন্ড গরমে আমরা সবাই ঘেমে নেয়ে একাকার। এই ট্রেইলে কোন ছোটখাটো ঝর্না নেই যে গা-টা অন্তত ভিজিয়ে নেব। ডুমুর ফল খাওয়া শেষে আমরা আবার চলা শুরু করলাম। তৃতীয় পাহাড়টি অতিক্রম করে আমরা সামনের পাঁচজন প্রচন্ড হাঁপিয়ে পড়েছি, বাকি সদস্যরা আমাদের থেকে অনেক পেছনে পড়ে গেছেন যাদেরকে গাইড করে নিয়ে আসছেন এডমিন রুপম ভাই, যিনি আগেও আরেকবার এসেছিলেন এখানে।

 

বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করা আর কিছুটা জিরিয়ে নিতে বসলাম আমরা। মিলন দাদার হাতে থাকা পানির বোতল থেকে সবাই পানি পান করে নিলাম। আমার হাতে থাকা ফিটব্যান্ড এ দেখলাম ইতোমধ্যেই ৫৪ মিনিট ধরে ট্রেকিং করছি আমরা, অতিক্রম করেছি ১.৮ মাইল। প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ, আরো প্রায় দেড় কিলোর মতো পথ আছে। টিমের বাকি সদস্যরা এসে পৌছালে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম, এই শেষ পাহাড়টি অতিক্রম করলেই ধূপপানি পাড়া…আর এরপর সেই কাঙ্খিত ধূপপানি ঝর্না। পাহাড়ি জুম ক্ষেত আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট সাঁকো পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ধূপপানি পাড়ায়, পাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ল কিছু তঞ্চঙ্গ্যা শিশু-কিশোর গাছের নিচে পাহাড়ী ফলমূল আর সবজির পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আমরা তাদের সাথে বেশ কিছু ছবি তুললাম আর কিছুদূর গিয়ে পাড়ার শেষ দোকানটিতে নাস্তা করে নিলাম। প্রায় চার কিলো পথ ট্রেকিং করে এসে আমার শত ক্লান্তি মুছে গেল এই দোকানের চা খেয়ে, কেননা আমি বরাবরই চায়ের নেশায় আসক্ত। আবারো সতেজ হয়ে উঠলাম পুরোদমে। এরপর আমরা অগ্রগামী ক’জন মিলন দাদাকে নিয়ে চললাম ঝর্নার উদ্দেশ্যে। খুব খাড়া পাহাড় বেয়ে নামার এই পথটুকু খুবই বিপজ্জনক, ধীরে ধীরে আমরা সবাই নিচে নেমে ঝিরিপথের দেখা পেলাম। এই ঝিরিপথ পেরিয়ে একটা ছোট পাথরে ঢাকা খুম পেরোতেই দেখা মিলল আমাদের প্রেয়সী- “ধূপপানির”। হাতে থাকা ব্যান্ডে দেখে নিলাম সময় লেগেছে দেড় ঘন্টা, অতিক্রম করেছি প্রায় ৫ কিলো পথ। ভরা যৌবনে প্রেয়সীর রূপ দেখলে ইচ্ছে করবে এখানেই সংসার পাতি। পানি কম থাকলেও বরাবরের মত এসেছি যখন উপভোগ করে তো যেতেই হবে। আমাদের দলের মিসবাহ নামের এক সদস্য খুব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে একটা বিশেষ আসনে ঝর্নার ওই খোপটাতে ধ্যানে বসে ছবি তুলবে, তার দেখাদেখি আমরা সবাই একে একে ছবি তুললাম।

 

আমাদের দলের বাকি সদস্যরা এলে পড়ে সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম। আমরা কজন নিচে নেমে এসে নিচ থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, এরই মধ্যেই হঠাৎ সাপ-সাপ করে চিৎকার চেচামেচি। আমার ঠিক কিছুদূর সামনেই ঝর্নার পাথর বেয়ে উঠার চেষ্টা করছে একটা সবুজ বোড়া সাপ, ইংরেজিতে যাকে বলে গ্রীন পিট ভাইপার…এর তিনকোণা চ্যাপ্টা মাথা আর সতেজ পাতার মতো সবুজ রঙ দেখেই চেনা যায়। আশেপাশের অনেকেই দূরে সরে গেল, অনেকেই বলছিল “মারো, সাপটাকে মারো”। যেহেতু আমি কাছেই ছিলাম ত্বরিত গতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম- আমরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছি, তাই প্রকৃতির কোন ক্ষতি করা যাবেনা। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে তুলে নিয়ে সাপটাকে ফেললাম একটা পাথুরে খোপের ভেতর, মোটামুটি শান্তই ছিল সাপটি। হাতে থাকা ক্যামেরায় কয়েকটা ছবিও তুলে নিলাম সবুজ সুন্দরীর, অনেক্ষণ পর শাহজাহান ভাই বললেন… “উপর থেকে পড়ছে সাপটা।” 

 

ঝর্ণায় ইচ্ছেমতো দাপাদাপি শেষে ফেরার পথে গ্রামের সেই দোকানে চলল পাহাড়ি মরিচ দিয়ে স্পেশাল ঝালমুড়ি পার্টি, ঝালে আমার তো যায় যায় অবস্থা। পাহাড়ের বুক চিরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নামছিল, বেশি বৃষ্টি হলে পরে ফেরার পথটা কঠিন হয়ে যাবে আমাদের জন্যে। আর তাই বেলা দুইটার দিকে আমরা আবার আমাদের বোটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। উঁচু নিচু কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে আমরা অগ্রগামী ক’জন বেশ দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সামনে ছিলেন সিনিয়র ট্রাভেলার শাহজাহান ভাই। বাকিরা গাইড মিলন দাদার সাথে আসছিল। পথিমধ্যে চোখে পড়ল পাহাড়ি পাকা কলার পসরা সাজিয়ে বসে আছেন এক নারী, আমরা কলা কিনে খেলাম। শাহজাহান ভাই অতি আবেগী হয়ে এক কাধি কাঁচা কলাও কিনে নিলেন, যখন কলার কাধি কাঁধে নিয়ে হাটছিলেন তখন অবশ্য টের পাচ্ছিলেন মজা। একঘন্টার ট্রেকিং শেষে আমরা বোটে ফিরে এলাম, এরপর খালের পানিতে নেমে গোছল সেরে নিয়ে বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আধঘন্টা পর দলের বাকি সবাই এসে পৌছালে আমাদের মাঝি ইউসুফ ভাই বোট চালু করে দেন। বরাবরের মতো ফেরার এই সময়টুকুতে আমার কেমন এক খারাপ লাগা কাজ করে, যেন বহু মূল্যবান কিছু স্মৃতি ফেলে যাচ্ছি এই গহীন অরণ্যে। ফেরার পথে আর্মি ক্যাম্পগুলোতে জানিয়ে বিলাইছড়ি এসে আমাদের অসুস্থ সদস্যটিকে তুলে নিলাম বোটে।

 

 


সন্ধ্যা নেমেছে বিলাইছড়িতে, আর আমরা যাত্রা করছি কাপ্তাই ঘাটের উদ্দেশ্যে। আবার কখনো আসা হবে কিনা জানা নেই, তবে খুব প্রাণপণে অনুভব করব এই পাহাড়ি সাদাসিদে জীবন আর এই মানুষগুলোকে। যেতে যেতে কাপ্তাই লেক ছেয়ে যায় ঘোর অন্ধকারে, এই অন্ধকার কেটে আমাদের বোট তরতর করে এগিয়ে চলছে সামনে। রাতের আঁধারে লেকের বুক চিরে বয়ে চলা কোন এক বোটের উপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখব- এ কখনো কল্পনাতেও ছিলনা, স্বপ্নের মতো অতিবাহিত হচ্ছিল সময়গুলো। ফেরার পথে সর্বশেষ গাছকাটা আর্মি ক্যাম্পে বোট থামল আমাদের সহি-সালামতে ফিরে আসাটা কনফার্ম করার জন্যে। এরপর রাত আটটায় কাপ্তাই জেটি ঘাটে গিয়ে থামল আমাদের বোট। এরপর জেটি ঘাট থেকে সিএনজি করে ফিরতি পথে বাড়ির পথ ধরা। আল্লাহ্‌র দরবারে অশেষ শুকরিয়া কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই বাড়ি ফিরে আসার জন্যে।



সাগরকন্যা সন্দ্বীপ

চারপাশে সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বেষ্টিত কোন এক দ্বীপে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করছিল, কম খরচে এই ইচ্ছে পূরণের জন্যে লক্ষ্য হতে পারে ...