এক টিকেটে পাঁচটি ছবি- আর সেই টিকেটের দাম মাত্র ৩৭০ টাকা... সাথে লাঞ্চ,স্ন্যাকস আর চা-নাস্তা ফ্রি, শিরোনাম দেখেই অনেকে হয়তো ঘাবড়ে গেছেন...ঘাবড়ানোর কিছু নেই, আসলেই সম্ভব। এই লেখাটা পড়লেই বুঝতে পারবেন।
>বেকার মানুষ আমি, কোন কাজবাজ নাই। বেশ কদিন ধরে ডে-ট্যুর দেয়ার জন্যে মনটা
আঁকুপাঁকু করছিল। তার উপর লাইফ এর রশদও ফুরিয়ে আসছিল। ছোট ভাই Mir H Mamun হঠাৎ পরশু নক দিয়ে বলে- ভাই, চলেন..রোববার ১ টিকেটে ৫ ছবি দেখে আসি।
যেই কথা সেই কাজ, একদিনেই একে একে খেলে দেয়া হলো চন্দ্রনাথ, সহস্রধারা-২, হরিনমারা ঝর্না, হাটুভাঙ্গা ঝর্না
আর কুমিরা ঘাট। আগের মতো বিশাল ভ্রমণ কাহিনী লিখার মতো কলম ও কালি হারিয়ে আর
ফুরিয়ে গেছে, তবুও ছোট ভাই মীরের অনুরোধে মুঠোফোনে
লিখবার চেষ্টা। 🤪
ভোরে ফজরের সালাত আদায় করেই আল্লাহর
নাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়া, গন্তব্য এ.কে.খান।
সাতটার মধ্যেই হাজির হলাম এ.কে.খান, কিছুক্ষণ পরই আসল ছোট ভাই মীর....কোন প্যারা নাই- দুই জনের Duo-Adventure. মীরের ভাষায় যতক্ষণ শরীরে কুলোয় দুই চোখ যেদিকে যায় ঘুরব
সারাদিন।
#চন্দ্রনাথ_পাহাড়ঃ প্রথমেই একেখান থেকে বাসে উঠে প্রায় একঘন্টা বাসজার্নির পর নামলাম সীতাকুণ্ডে, নিচে নেমে হালকা চা-নাস্তা করে কলেজ রোড় এর মোড় থেকে অটোতে করে চলে গেলাম ১২০০ ফিট উঁচু পাহাড়ে ক্যালরি কমাতে 😂। ভোরবেলা আশপাশটা কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন লাগছিল, হয়তোবা এ শীতের আগমনী বার্তা। মীর বারবার হাঁপিয়ে পড়ছিল, যদিও অন্যান্যদিন ওর এমনটা হয়না। আমার হার্টের অবস্থাও যে খুব একটা ভাল ছিল তা নয়, বিগত কয়েকদিন ধরে প্রচুর ধকল নিতে নিতে হার্ট একরকম ক্লান্ত। তবুও এডভেঞ্চার এর নেশা যে মোদের পিছু ছাড়ে না। চলতে চলতে সামনে পড়ল বিরুপাক্ষ মন্দির, মন্দিরের পাশে বেশ ক্ষাণিক্ষন জিরিয়ে নিলাম। মৃদুমন্দ বাতাস আর বৃক্ষরাজির সুশীতল ছায়া আমাদের ক্লান্তি কিছুটা হলেও উপশম করে দিচ্ছিল। এরপর আবার যাত্রা শুরু করলাম, আরো খানিকটা পথ বাকি। খাঁড়া পাহাড়ের ঢালগুলো বাইতে বাইতে এক সময় এসে পৌঁছলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়, কিছুটা সামনেই চন্দ্রনাথ মন্দির। পাক্কা এক ঘন্টা লেগেছে আমাদের। আমরা মন্দিরের সামনে পাহাড় ঘেষে থাকা রেলিং এ ক্ষানিকটা বিশ্রাম নিয়ে নিলাম আর দুই ভাই আড্ডার মাঝে নিজেদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খাতা খুলে বসলাম। এরপর কিছু ছবি মুঠোফোনে বন্দী করে নামার সিঁড়ি ধরলাম। নামার পথটুকু খুবই রোমাঞ্চকর যদি আপনি জাত ট্রাভেলার হোন, নয়তো ধীরে ধীরে নামাটাই উত্তম। আমরা এক রকম দৌড়ে দৌড়েই নেমে পড়েছিলাম, সময় লেগেছিল মিনিট বিশেক এর মতো। ঘড়িতে দেখি মাত্র এগারোটা বাজে, এরপরের গন্তব্য সহস্রধারা-২ এ যাবার উদ্দেশে আমরা আবার প্রধান সড়কে ফিরে এলাম।
#সহস্রধারা_২ঃ সীতাকুণ্ড থেকে লেগুনায় চড়ে ছোট দাওগারহাট এসে নামলাম।
এরপর লোকাল সিনজি-তে করে সোজা সহস্রধারা-২। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে একখানা লেক, বোটে করে এই লেক পেরোলেই ঝর্না আপুর দেখা পাওয়া যাবে। আমরা
বোটে করে পৌঁছতেই দেখি ঝর্না আপু তার উন্মত্ত যৈবন নিয়ে ঝরে পড়ছে সহস্রধারায়।
দুদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় ঝর্নাতে বেশ ভালোই পানি পেয়েছি আমরা। আমি আর মীর পানিতে
নেমে ঝর্নার কাছে যেতেই হঠাৎ করে যেন ঝর্নার পানির গতি বেড়ে গেল , মাথা আর পিঠের উপর করছিল যেন কেউ অবিরাম গুলিবর্ষণ। রোববার
হওয়াতে আজকের পরিবেশ মোটামুটি নিরিবিলি ছিল। যাই হোক, ঝর্নার নিচে বসে অনেক্ষণ একান্তচিত্তে ভিজলাম। সৃষ্টিকর্তার
সৃষ্টির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলাম আর বারংবার বলছিলাম
সুবহানআল্লাহ, আল্লাহু আকবর।
ঝর্নায় গোছল শেষ করে মুঠোফোনে কিছু
ছবি ধারণ করে বোটের জন্যে অপেক্ষায় রইলাম। এরপর বোটে করে পূর্বের স্থানে এসে লোকাল
সিএনজি করে আবার ছোট দারোগারহাট ফিরে
এলাম। ঘড়িতে সময় তখন দুপুর দেড়টা, এরপরের লক্ষ্য ছোট
কমলদহের হরিনমারা ঝর্না।
#হরিনমারা_ট্রেইলঃ লেগুনা থেকে ছোট কমলদহ নেমে রওনা করলাম হরিনমারা
ঝর্নার উদ্দেশ্যে। সাথে জুটেছিল জনা সাতেকের মত আনকোরা পর্যটক। ওদেরকে আমরা দুজন
পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে মীর একটা
মজার ফন্দি আটলো-
-সানি ভাই, চলেন আমরা আমাদের ১ নম্বর গিয়ারে হাটা শুরু করি।
-কি বলো? ওরা তো পিছাই পড়বে।
-আরে সমস্যা নাই ভাই, একটাই রাস্তা। একটু মজা না করলে কি হয়?
এরপর আমরা আমাদের সচরাচর ট্রেইলের
বেগে হাটা শুরু করলাম, মিনিট পাচেক পর
পেছনে ফিরে দেখি ওই দলটির কোন অস্তিত্ব নেই। এরপর আরো মিনিট পাচেক অপেক্ষা করে
দেখলাম ওরা সৈনিকদের মতো দৌড় করতে করতে আসছে। আমাদের এমন হাসি পেলো, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম। পাশেই মীরের মামাবাড়ি, তাই আমাদের একটু ঘুরতি পথ ধরতে হলো। আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে আমরা
এখানেও এক লেকের সামনে এসে পড়লাম। আনকোরা ট্যুরিস্ট দের দল খাবার হোটেলে ঢুকে
বেরুনোর কোন নামগন্ধ নিল না...আমি আর মীর আমাদের মতো চলতে শুরু করলাম। লেকে কেবল
একটাই বৈঠা চালিত নৌকা। যদিও পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায় ঝর্নায়, কিন্তু লেকের পানি বেড়ে যাওয়াতে অপেক্ষাকৃত সহজ রাস্তাটি
পানিতে ডুবে গিয়েছিল। বোটে না গিয়ে আমরা একটু ঘুরতি পথের রাস্তাটা ধরলাম।
উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঝোপ-ঝাড় আর পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথ বেয়ে আমরা সামনে এগিয়ে
যাচ্ছিলাম, সূর্য তখন ঠিক আমাদের মাথার উপর।
প্রায় ত্রিশ মিনিটের ট্রেকিং শেষ করে ঝিরির দেখা পেলাম, সেই ঝিরি ধরে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল হরিনমারা
ঝর্না। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই, কেবল আমি আর মীর।
পরিবেশটাও কেমন গা ছমছমে। এরপর মুঠোফোনে কিছু ছবি তুলে নিয়ে মীর আর আমি আবিষ্কার
করলাম আমাদের জোঁকে ধরেছে, জোঁক ছাড়ানো শেষে
যোহরের সালাত আদায় করে নিলাম। এরপর হাটুভাঙ্গা ঝর্নার উদ্দেশ্যে পা বাড়ানো।
#হাটুভাঙ্গা_ঝর্নাঃ হরিনমারা ঝর্না শেষে পাশেই আরো দুটি ঝর্না আছে। আমরা
হাটুভাঙ্গা তেই যাবো বলে ঠিক করলাম, দেখি কেমন হাটু ভাঙতে পারে আমাদের। বেশ ক্ষাণিক্ষণ ঝিরিপথ ধরে ট্রেইল শেষে
দেখি ঝর্নাটা বেশ ভালোই, তবে পিচ্ছিল এবং
উঁচু। খুব সম্ভবত এই ঝর্না বেয়ে কেউ উঠতে গিয়ে হাটু ভেঙেছিল। আমি এডভেঞ্চার এর
লক্ষ্যে ঝর্না বেয়ে উঠতে গেলে মীর আমাকে হাটু ভাঙার ব্যাপারে সতর্ক করে, পরে অর্ধেক উঠে নেমে যাই। এরপর বেশ কিছু সেলফি আর ঝর্নার
ছবি তুলে ফেরার পথ ধরি। ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল সেই ট্যুরিস্ট দল এর সাথে....তারা
নাকি আমাদের এক পর্যায়ে জ্বিন ভেবে বসেছিল...হঠাৎ হঠাৎ আমরা অদৃশ্য হয়ে
যাচ্ছিলাম...আবার খুব দ্রুত ট্রেইল শেষ করে ওদের আগে ফিরে যাচ্ছি। 😆😆😆
ফিরে যাবার পথে অবশ্য আমরা ভুল পথে
গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলি, যেই পথটা লেকের
পানিতে ডুবে গেছে। পরে আবার মিনিট বিশেকের প্রচেষ্টায় পথ খুজে পাই...এই সময়টা খুব
রোমাঞ্চকর ছিল আমাদের দুজনের জন্যে। ঝর্নার ট্রেইল সব শেষ করতে করতে বিকেল চারটা
বেজে গিয়েছিল। ওই এলাকার সুপরিচিত "ড্রাইভার হোটেল" এ মাত্র ১৬৫ টাকায়
চিকেন দিয়ে দুজনে লাঞ্চ মেরে দিলাম 😂। এরপর সূর্যাস্ত দেখার পালা...উদ্দেশ্য কুমিরা ঘাট।
#কুমিরা_ঘাটঃ ছোট কমলদহ থেকে একটা লোকাল ডিস্ট্রিক্ট বাসে চড়ে বড়
কুমিরা ঘাটে এসে নামলাম। ঘাটে পৌঁছানোর জন্যে নিচে নেমে রিকসা নিতে হলো, আমরা তখন ঘাট থেকে খানিকটা দূরে....টকটকে লাল সূর্য অস্ত
যাবার অপেক্ষা করছে। সূর্যাস্ত যে এতোটা সুন্দর হতে পারে, আজ খুব কাছ থেকে তা উপভোগ করলাম। সূর্য অস্ত যেতে না যেতেই
আকাশের একপাশে চাঁদের দেখা পেলাম। প্রকৃতি যেন আজ তার সব রুপ ঢেলে দিয়েছে আমরা আসব
বলে। খানিকটা সময় ঘাটে কাটিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম।
#পুনশ্চঃ প্রিয় শহর ছাড়ার আগে খুব
সম্ভবত আজকের এই ট্যুরটা আমার শেষ ট্যুর। বহুদিন স্মৃতি হয়ে থাকবে আজকের
মুহূর্তগুলি।







No comments:
Post a Comment