Thursday, January 21, 2021

সাগরকন্যা সন্দ্বীপ

চারপাশে সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বেষ্টিত কোন এক দ্বীপে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করছিল, কম খরচে এই ইচ্ছে পূরণের জন্যে লক্ষ্য হতে পারে একটি দ্বীপ। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাঝ বরাবর এই দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপটির চারপাশে বিশাল বিশাল জাহাজের আনাগোনা, নদী আর সমুদ্র যেন অতি আদরে এই দ্বীপকে আগলে রেখেছে। নদী আর মোহনার ঘোলাটে মিশ্রণ ধীরে ধীরে নীলাভ হয়ে হারিয়ে গেছে গভীর সমুদ্রে, যাওয়ার আগে রেখে গেছে অদ্ভুত সুন্দর সবুজ এক দ্বীপ। তাই আমার এবারের গন্তব্য এই জল-সবুজের সন্দ্বীপে।

সন্দ্বীপের ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় প্রায় তিন হাজার বছর এর অধিককাল ধরে এখানে লোক বসতি, এক সময় নাকি নোয়াখালী জেলার সাথে যুক্ত ছিল এই দ্বীপ। লবণ শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও বস্ত্র শিল্পে ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। 

কোন রকম ট্যুর প্লান ছাড়াই দুপুরের আহার শেষ করে বেরিয়ে পড়ি কুমিরা ঘাটের উদ্দেশ্যে, পথিমধ্যে ছোটভাই মীরকেও সাথে নিয়ে নেই। কুমিরা ঘাট থেকে কিছুক্ষণ পর পর স্পীড বোট ছেড়ে যায় সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ঘাটের উদ্দেশ্যে। দুজনে দুটো টিকিট কেটে নিয়ে বোটে উঠলাম, ধীরে ধীরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম বঙ্গোপসাগরের ফেনিল জলরাশি কেটে। উপরে গাংচিল, চারপাশে অথৈ সাগর, আশেপাশে দুয়েকটা মাছ ধরার ট্রলার আর পশ্চিম আকাশে সূর্য... এর চেয়ে মনোরম প্রকৃতি বুঝি আর হয়না। মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছিল হোসেন মিয়ার সেই ময়না দ্বীপ, সময় যেন আর কাটছিল না...কবে দেখা মিলবে সেই ময়না দ্বীপের। প্রায় মিনিট বিশেক পর দূরে দেখা মিলল সেই দ্বীপের, আরো কাছে যেতেই দ্বীপের সুবিশাল ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের আতিথেয়তায় মুগ্ধ আমি। ম্যানগ্রোভের ওপাশে অস্তগামী সূর্য অপেক্ষা করছে পাটে নামবে বলে। বোট থেকে নেমেই ঘাটের সিড়ি বেয়ে উঠে আসলাম, জোয়ার থাকায় আর কাদায় নামতে হলোনা। 

গুপ্তছড়া ঘাটে কাপ্তাই ক্যাম্পিং ট্যুরের মোরগ ফয়েল অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। আমাদের দেখেই সাদর অভ্যর্থনা জানালো আর আমরা কালক্ষেপণ না করে ওর মোটর বাইকে উঠে বসলাম। দুর্দান্ত গতিতে বাইক ছুটে চলছিল দ্বীপের পাকা সড়ক ধরে, আশে পাশে তাল, নারকেল, সুপুরি গাছের সারি দেখে সত্যিই প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। বাইক এসে থামলো সেনার হাট, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ভাই আমাদের হোস্ট। একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সাইফুল ভাইয়ের সাথে সন্ধ্যায় বের হলাম নাস্তা করতে। একটা বিষয় খেয়াল করলাম সন্দ্বীপে ঘরে মোটর বাইক, ঠিক যেন এক একটা ঘোড়া....পরে অবশ্য জানতে পারলাম এই বাইকগুলো বেশিরভাগই বর্ডার ক্রস আর লাইসেন্স ছাড়া। সন্দ্বীপের মিস্টি খুব বিখ্যাত, আর তাই মিস্টি দিয়েই শুরু করলাম নাস্তা। ফেরার পথে হাটে তাজা চেওয়া মাছ কিনে নিলেন সাইফুল ভাই। আমার খাবার নিয়ে তেমন একটা বাছবিচার নেই, তারপরও আগে চেওয়া মাছ খাইনি...তাই একটু অস্বস্তিতে ছিলাম। আমার অস্বস্তি টের পেয়ে মীর...

- কি সানি ভাই? তাজা চেওয়া মাছ দিয়ে চলবে আজকে। খান নি চেওয়া মাছ?

- ম..ম... আসলে আগে খাওয়া হয়নি কখনো। তারপরও সমস্যা নাই...চলবে। 

চেওয়া মাছ খাইনা শুনে সাইফুল ভাই বড় দেখে একটা ইলিশ মাছও কিনে নিলেন। এরপর নিলেন চাল, টমেটো আর মাছের মশলা। সাইফুল ভাইয়ের আতিথেয়তায় যারপরনাই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। বাজার সদাই শেষে সবাই বাসায় গেলাম, সাইফুল ভাই মাছ কাটাকুটিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন আর আমি আর মীর পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচামরিচ কাটাকুটি করছিলাম। আমাদের কাটাকুটির মাঝেই ফয়েল এলো বাসায় আর চলে গেলাম ওর সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতে। যতই সময় গড়াচ্ছিল সন্দ্বীপের মানুষজনের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হচ্ছিলাম। খেলা শেষে বাসায় ফিরে দেখি পাকা রাধুনির মতো সাইফুল ভাই ইলিশ মাছ, চেওয়া মাছ আর ভাত রান্না করে বসে আছেন। এবার খাবার পালা, প্রথমেই চেওয়া মাছ দিয়ে শুরু করলাম....এরপর ইলিশ। পাকা রাধুনি হাতের জাদুতে সত্যি খুবই সুস্বাদু হয়েছে দুটি পদই। খাবার শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ গল্প-আড্ডা শেষে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। 

পরদিন দেরি করে উঠলাম ঘুম থেকে, সকাল সকাল একটু বেশিই ঠান্ডা পড়ছিল। সকালের নাস্তা হিসেবে পরটা দিয়ে চেওয়া মাছ চালিয়ে দেয়া হলো, এরপর সাইফুল ভাই অফিসে চলে গেলেন, আমি আর মীর ক্যারম খেললাম বেশ কিছুক্ষণ। দুপুরের দিকে সাইফুল ভাই এলেন গরুর মাংস নিয়ে, আবার সবাই মিলে রান্নাবান্না হবে। সাইফুল ভাই লেগে পড়লেন কাটাকুটিতে, আমি আর মীর আবার পেঁয়াজ, মশলা,আদা,রসুন,কাঁচা মরিচ কাটাকুটি করছিলাম। গরুর মাংস হাড়িতে চাপিয়ে দিয়ে গত রাতের ইলিশ মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। খাওয়া দাওয়া আর রান্না শেষ হতেই আমরা বেড়ানোর জন্যে প্রস্তুত, ফয়েল তার বাইক নিয়ে এসে পড়লো...সাথে আসলো ফয়সাল। আমরা পাঁচজনে দুটো বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম.... গন্তব্য কালাপানিয়া। 

দুপাশে তাল, নারকেল, সুপারি গাছের সারি আর গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে দেখতে সাই সাই করে পাকা রাস্তা ধরে মোটর বাইকে ছুটে বেড়াতে বেশ ভালোই লাগছিল...বেশ ক্ষাণিক্ষণ পর আমরা কালাপানিয়া এসে পৌঁছলাম। দ্বীপের এই পাশটায় মেঘনা নদীর মোহনা...উড়িরচর দেখা যাচ্ছে দূরে, মাঝে মাঝে বেশ কিছু নারকেল গাছের সারি...যেন ছোটখাটো নারিকেল জিঞ্জিরা। পশ্চিমের আকাশে সূর্য অস্তমিত প্রায়, ওই দূরে মেঘনার জল গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। পতেঙ্গায় কর্ণফুলীর মোহনায় বড় হয়েও যে অদ্ভুত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি তা উপভোগ করছি এই সন্দীপ এসে। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম আমরা কালাপানিয়ায়, মুঠোফোনে বন্দী করে নিলাম কিছু ছবি। মীর এর এক বিশেষ টেকনিক্যাল লাফালাফি বিশেষ এংগেল এ ফ্রেমবন্দী করলাম...দেখে মনে হয় লাফিয়ে অনেক উঁচুতে উঠে পড়েছে। কালাপানিয়া থেকে বাইকে চড়ে আবার ফিরে আসলাম বাসায়। সন্ধ্যায় আবার চললো ব্যাডমিন্টন, আড্ডা আর রাতের খাবার। 


পরদিন তেমন একটা ঘুরোঘুরি হয়নি, আমি আর মীর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে গিয়ে একটু হাটাহাটি করলাম। মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম এর স্মৃতিবিজড়িত এই সন্দ্বীপ,   মহাকবি আব্দুল হাকিম অডিটোরিয়াম এর সামনে কিছু ছবি নিলাম। বিকেলের দিকে একাই বের হয়েছিলাম। মীর আর সাইফুল ভাই ঘুমোচ্ছিল, আশপাশটায় হাটাহাটি করে আর ছেলেপিলেদের ক্রিকেট খেলা দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামল। রাতে উপভোগ করলাম ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট এর সেমি ফাইনাল খেলা। চরম উত্তেজনা আর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এর মধ্য দিয়ে দুটো টিম ফাইনালে উঠে।


তৃতীয় দিন বাটা মাছ দিয়ে দুপুরের আহার সেরে ঘুরতে বের হলাম। আমাদের ড্রাইভার ফয়েল তার বাইক নিয়ে এলে আমি আর মীর উঠে পড়লাম। এবার গেলাম শিবের হাটের দিকে, শিবের হাট পেরিয়ে একদম শেষে সওদাগর হাট। জেলেরা নানান জাতের সামুদ্রিক মাছ ধরে এনে নিলামে তুলছে। ওই দূরে ভাসানচর, কুয়াশার কারনে অস্পষ্ট যদিও। এদিক ওদিক ঘুরেফিরে একটা বালুবাহী ট্রলারে উঠলাম। বালুবাহী ট্রলারের গঠন, আকার আর আকৃতি নিয়ে মীর আর ফয়েলের সাথে কিছুক্ষণ আলোচনা করে বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম।এরপর আবার বাইকে করে ছুটে চলা...এসে থামলাম সেই ঐতিহ্যবাহী "বিনয় সাহা'র মিষ্টি" দোকানের সামনে। তিনজনে পরটা দিয়ে চেখে নিলাম বিখ্যাত আর সুস্বাদু মিস্টি। ফিরে আসার পথে এনাম নাহার মোড়ের স্পেশাল চা'ও টেস্ট করে আসলাম। 




সন্ধ্যায় ফয়েলের বাসায় আমাদের দাওয়াত ছিল..সাইফুল ভাই, মীর, মোস্তাকিম ভাই আর আবছার ভাই মিলে গেলাম ফয়েলের বাসায়।নানান পদের নাস্তা দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করা হলো। গল্প, আড্ডা আর খানাপিনায় জমে উঠল আসর। খাওয়া-দাওয়া শেষে ব্যাডমিন্টন খেলার ফাইনাল উপভোগ করলাম সবাই মিলে। টানটান উত্তেজনার মধ্যে রবিনের টিম চ্যাম্পিয়ন হলো,বিজয়ীদের হাতে সাইফুল ভাই পুরস্কার তুলে দিলেন। 


পরদিন সকালে উঠেই গোছগাছ শুরু করলাম। জীবিকার সন্ধানে ফিরে যেতে হবে আমায়...মীর থেকে যাবে আরো ক'টা দিন। ফয়েলের মোটর বাইকে চড়ে রওনা দিলাম গুপ্তছড়া ঘাটের উদ্দেশ্যে। ঘাটে প্রচুর ভীড়, আশেপাশের  ম্যানগ্রোভ সারি যেন আমার বিদায়ের শোকে স্তব্ধ...ভাটার কারণে পানি অনেকটা নেমে গেছে। টিকিট কেটে প্রায় আধ ঘন্টা অপেক্ষার পর কাদা মাড়িয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে বোটে উঠলাম আর বিদায় জানালাম সাগরকন্যা সন্দ্বীপকে। ইঞ্জিন চালু হতে না হতেই সাগরের বুকে দ্রুত এগিয়ে চলছে আমাদের স্পীড বোট আর ওই দূরে ধীরে ধীরে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল আমার স্বপ্নের ময়না দ্বীপ।

সাগরকন্যা সন্দ্বীপ

চারপাশে সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বেষ্টিত কোন এক দ্বীপে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করছিল, কম খরচে এই ইচ্ছে পূরণের জন্যে লক্ষ্য হতে পারে ...