“Traveling—it leaves you speechless, then turns you into a storyteller” ইতিহাসের বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার এই বিখ্যাত উক্তির মধ্যেই ফুটে উঠেছে সকল ভ্রমণপিপাসু মনের এক অপার পরিতৃপ্তি। কালের বিবর্তনে ভ্রমণকাহিনী লেখার স্থান দখল করে নিয়েছে ক্যামেরায় তোলা ছবি। কিন্তু এই লেখালেখির মধ্যে যে কি আনন্দ তা একমাত্র প্রকৃত লেখক, পাঠক আর তাদের অনুসরণকারীরাই বুঝেন। ট্যুরের আগেই জানিয়েছিলাম ফিরে এসে বিস্তারিত গল্প হবে, আর তাই সময় সুযোগ বুঝে ধুপপানি ট্যুর নিয়ে লিখে ফেললাম। এখন অবশ্য লোকের হাতে এত লম্বা লেখা পড়ার সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার? যদি ধৈর্য্য ধরে পুরো গল্পটা পড়তে পারেন আশা করি নিরাশ হবেন না। গল্পের শুরুটা অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে, বহুদিন ধরেই এমন কোন গ্রুপের খোঁজে ছিলাম যাদের সাথে নিশ্চিন্তে ট্যুর দেয়া যায়। বন্ধু নিশাতের মাধ্যমে Share Basis Tour গ্রুপের সাথে পরিচয় যারা শেয়ার বেসিসে (যা খরচ হবে ট্যুরের সবাই সমানভাবে) ট্যুর আয়োজন করে থাকে। প্রথমে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছিল না, এতো কম খরচে এরা ট্যুর আয়োজন করে কিভাবে? এখন সব জলের মতো পরিষ্কার, সবকিছুর মূলে আন্তরিকতা…যা খুব কম ট্রাভেল গ্রুপেই দেখা যায়।
#প্রথম_দিন
এবার মূল গল্পে যাওয়া যাক। শেয়ার
বেসিস গ্রুপের ধুপপানি ট্যুর দেখেই কাপ্তাই লেক ও আশেপাশের উপজাতিদের জীবনযাত্রা
নিজ চোখে দেখে আসার ইচ্ছেটা পুনরায় জেগে উঠে। তাড়াতাড়ি এডভান্স পে করে সিট বুক করে
নিলাম কেননা এই ট্যুরের টিম সাইজ ছিল ১৫-১৭ জন। একটা পুরো ট্রলার ভাড়া করা হচ্ছে
দুদিনের জন্যে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ৩০
জনের বোটে ১৫ জন আরকি। ২৯ তারিখ শনিবার ভোর সাড়ে চারটায় ফজরের সালাত আদায় করেই
আল্লাহ্র নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, মিটিং স্পট…রাস্তার
মাথা…ভোর ৬ টা। সিএনজি নিয়ে ভোর ছটার বেশ কিছুক্ষণ আগেই রাস্তার মাত্রা পৌঁছে দেখি
ট্যুর এডমিন রুপম ভাই, সিনিয়র ট্রাভেলার শাহজাহান ভাই ও বেশ
কয়েকজন অপেক্ষা করছে। ছটা বাজতেই একে একে লিচুবাগান এর সিএনজি ধরলাম, এরপর লিচুবাগান থেকে কাপ্তাই পৌছালাম। ঘড়িতে তখন আটটা, কাপ্তাই জেটি ঘাটের বাজার থেকে সকালের নাস্তা, আপেল,
পানি, বন-কলা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র
নিয়ে আমাদের ভাড়া করা বোটে উঠলাম, আজকের দিনেই মুপ্পোছড়া আর
ন-কাটা ঝর্না দুটো দেখার পরিকল্পনা আছে। আর তাই বোট সরাসরি আমাদের নিয়ে যাবে ঝর্না
দুটির উদ্দেশ্যে। সবাই উঠে বসতেই আমাদের বোটের মাঝি ইউসুপ ভাই ইঞ্জিন চালু করলেন,
ইঞ্জিনের এই শব্দ প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তিকর লাগলেও একটা সময় গিয়ে
এর সাথে মানিয়ে নিয়েছে সকলেই। এমনকি দ্বিতীয় দিন ইঞ্জিনের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
আমি নিজেই। আমাদের বোট যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল কাপ্তাই লেকের মোহনীয় সৌন্দর্যে
ততোই মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল কাপ্তাই বাঁধের ১৬ টি গেট
বিশিষ্ট স্পিলওয়ে, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে যে
বাঁধের সৃষ্টি আর জলাধার হিসেবে দেশের একমাত্র কৃত্তিম হ্রদ। লেকের নীল স্বচ্ছ জল
কেটে কেটে বোট যতই এগিয়ে যাচ্ছিল সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টির সৌন্দর্যে বারংবার
মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আধ ঘন্টার পথ পাড়ি দেয়ার পর আমরা গাছকাটা আর্মি ক্যাম্পের সামনে
এসে পৌঁছলাম, এডমিন রুপম ভাই সকলের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
আর্মি ক্যাম্পে জমা দিয়ে আমাদের গ্রুপ ছবি তুলে নেয়ার পর আমরা এন্ট্রি পারমিশন
পাই। সেনা সদস্য থেকে জানতে পারলাম এখানে রবি আর টেলিটক ছাড়া আর কোন সিমের
নেটওয়ার্ক নাই, সাথে সাথে আমার মাথায় হাত…কেননা আমার সিম
দুটো হচ্ছে গ্রামীণ আর বাংলালিংক। কি আর করার, বোটে যেতে
যেতে খানিক বাদেই নেটওয়ার্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম দুদিনের জন্যে।
প্রথম আর্মি ক্যাম্প পেরিয়ে আমাদের
বোট সামনের দিকে এগিয়ে চলছিল....ইতোমধ্যে আবিষ্কার করলাম সবাই আমরা বোটের চালার
উপর, আর তাই সকালের নাস্তাটা এখানেই হয়ে গেলে
মন্দ হয় না। নিচ থেকে পরটা আর ভাজির প্যাকেট উপরে আনা হলো। আশে পাশে পাহাড়ে আর ঘন
জঙ্গলে ঘেরা কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বোটের উপর সকালের নাস্তা,
আহ...সে এক অনন্য তৃপ্তি। এই এলাকার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র
মাধ্যম এই জলপথ, আর তাই আশে পাশে চোখে পড়ছিল ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন সাইজের নৌকা আর ট্রলার। ওই দূরে
সাদা বক লেকের পানিতে মাছ শিকারে ব্যাস্ত। আশে পাশের টারশিয়ারি যুগের ছোট বড়
পাহাড়গুলো মাথা উঁচু করে যেন বলছে- "হ্যাঁ ভাই, আমাদের
জন্ম হিমালয় গঠনের সময়কালেই"।
ঘন্টাখানেক বাদেই আমরা বিলাইছড়ির
সেনা সদর ক্যাম্পের ঘাটে পৌঁছলাম, এই ক্যাম্পেও NID
জমা দিয়ে আজকের দিনের মুপ্পছড়া ও নকাটা ঝর্না ট্রেইলের অনুমতি নিতে
হলো।
আর্মি ক্যাম্প থেকে বোট যাত্রা শুরু
করল আঁকাবাকা খাল হয়ে, এবারে লেকের পানির
পরিমাণ কম হওয়ায় লেকের শাখা-উপশাখাগুলোর পানি শুকিয়ে খাল হয়ে গেছে। প্রায় দু ঘন্টা
বোট জার্নির পর বাঙ্গালকাটা ঘাটে এসে ভিড়ল আমাদের তরী। আমি আর শাহজাহান ভাই সবার
আগেই নেমে পড়লাম বোট থেকে, যত দ্রুত ট্রেইল শুরু করা যায়।
কিন্তু বাকি সবার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আর গাইড ভাড়া করে সাথে নিতে নিতে প্রায়
মিনিট বিশেকের মতো অতিবাহিত হলো। আমাদের গাইড সুমন চাকমা একটা ৫ লিটারের পানির
বোতল নিয়ে তরতর করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। মাথার উপর সূর্য যেন মগজ থেকে সব জল শুষে
নিচ্ছে, মিনিট বিশেক ট্রেইল করতে না করতেই মোটামুটি হাপিয়ে
গেলাম। আমরা ৫-৬ জনের দল বাকি সবার থেকে অনেক এগিয়ে এসেছি, তাই
খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে জল খেয়ে নিলাম। হাতে চাপা এক ধরনের পাহাড়ি টিউবওয়েল দেখলাম
যা সচরাচর সমতলে দেখিনি কখনো, সুমন দাদার ভাষায় এটা ফ্রিজের
পানি। আসলেই...এতোটা ঠান্ডা পানির জলে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। বাকি সবার দেখা মিলতেই
আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে বেশ কিছু
ঝিরিপথের দেখা মিলল। দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে এরকম ঝিরিপথ পা ভেজানোর অনুভূতি
ভাষায় প্রকাশের নয়। হাটতে হাটতে আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক এর পথ অতিক্রম করলাম, চোখে পড়ল ছোট একটি ছরা। আমাদের মতো আরো বেশ কয়েকটি টিমের
আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছিল, আর তাই পর্যটকদের ভীড়ে প্রকৃতির
সান্যিধ্য ঠিকঠাক উপভোগ করতে পারছিলাম না। আরো কিছুদূর যেতে না যেতেই বিপরীত দিক
থেকে ফেরত আসা পর্যটকদের মুখে আফসোস দেখতে পাচ্ছিলাম। এই শুকিয়ে যাওয়া ঝর্না দেখতে
এতদূর আসাতে এরা কেউই সন্তুষ্ট নয়। সে যাই হোক, এসেছি যখন
পানি কম হলেও দেখে যেতেই হবে...কেননা আমি মনে করি পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্নাগুলো
আপনার প্রেয়সীর মতোই, যা
চিরযৌবনা থাকবে না...তবুও ভালবেসে যেতে হবে নিরন্তর। নির্জন নিরিবিলি
কয়েকটি ক্যাসকেড এর ভিডিও ধারণ করে নিলাম মুঠোফোনের ক্যামেরায়। এরপরই দেখা মিলই
সেই প্রতিক্ষিত মুপ্পোছড়া ঝর্নার, ঝর্নার পানি কম থাকলেও
এতদূর পথ ট্রেইল করে এসে এই ঠান্ডা পানিতে গা ভেজানোর মতো আনন্দের আর কিছুই হয়না।
অতঃপর বেশ খানিক্ষণ টিমের বাকি সদস্যরা সহ ঝর্নার পানিতে গোসল করে ফিরতি পথে
যাত্রা শুরু করলাম নকাটা ঝর্নার উদ্দেশ্যে।
ন-কাটা ঝর্নার নামার পথটা বেশ
পিচ্ছিল ছিল, ট্রেকিং স্যান্ডেল আর হাতে থাকা
লাঠির সহায়তায় অবশ্য তেমন বেগ পেতে হয়নি। উপর থেকে নেমে আসা পানির স্রোত বিশাল খোপ
খোপ কাটা পাথরের উপর আছড়ে পড়ছে, বাংলা নয় এর মতো দেখতে বলেই
হয়তো এই ঝর্নার নাম ন-কাটা। ঝর্নার পানিতে গা ভিজিয়ে আর মুঠোফোনে ছবি ধারণ করে
ফেরার পথ ধরলাম আমরা। বোটে যখন ফিরে আসি তখন প্রায় দুপুর দুইটা। এখন বিলাইছড়ি গিয়ে
আগে থেকেই বুক করে রাখা কটেজে উঠব। প্রায় আধঘন্টার বোট জার্নির পর আমরা বিলাইছড়ি
ঘাটে এসে নামলাম, ভাতঘর হোটেলে জুমের চালের ভাত, আলুভর্তা আর মুরগি দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে উঠলাম “স্বপ্ন বিলাস”
বোর্ডিং এ। ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বোটে করে আশপাশটা ঘুরে দেখা
যাবে। ঠিক এই পড়ন্ত বিকেলে প্রকৃতি যেন আমাদের তার সকল রূপ-রস ঢেলে দিয়েছিল…শেষ
বিকেলের দিকে দীঘলছড়ি সেতু পেরিয়ে কিছুটা সামনে যেতেই উপভোগ করছিলাম ওই দূরে
পাহাড়ের পেছনে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। খানিক বাদে আমরা বোটের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলাম
প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটাতে। মাগরিবের সময় হলে বোটের ছাদের একপাশে আমরা
কয়েকজন সালাত আদায় করে নিলাম আর আল্লাহ্র এই অশেষ নিয়ামতের শোকরিয়া জ্ঞাপন করলাম।
অন্ধকার নামতে নামতে বোটের উপর বসল আড্ডার আসর, ওই দূরে
নলখাগড়ার বন…মৃদুমন্দ বাতাস আর এই সান্ধ্যকালীন আড্ডা এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি
করেছিল। সেই সোনালী মুহূর্তগুলি আবার কখনো ফিরে পাবো কিনা জানিনা, আড্ডার এক পর্যায়ে আমরা কলা, বন, জাম্বুরা, পেয়ারা আর আপেল দিয়ে নাস্তা করে নিলাম।
এরপর শুরু হলো গানের আসর…ঘন্টাখানেক পরে আমরা আবার রওনা দিলাম বিলাইছড়ি ঘাটের
উদ্দেশ্যে।
লেকের আইড় মাছ, আলু ভর্তা, ডাল আর জুমের চালে হলো রাতের
খাবার। খাবার শেষ করে কিছু সময় কাটালাম বোটের উপর…আমাদের সহকারী মাঝি বিজয় চাকমার
জীবনের গল্প শুনতে শুনতে। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল এক পাহাড়ী তরুণীকে, দেখেছিল বিয়ের স্বপ্ন পাঁচটি বছর ধরে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডন,
তরুণীর পরিবার থেকে অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়ে যায়…যেখানে সে টিকতে
পারেনি বেশিদিন। প্রচন্ড নির্যাতন আর মানসিক অশান্তিতে অসুস্থ হয়ে এক সময় মৃত্যুর
কোলে ঢলে পড়ে। সেই থেকে বিজয় চাকমা হাতে তুলে নিয়েছে পাহাড়ি মদের বোতল। এখন তার
জনা-পাঁচেক বান্ধবী, কিন্তু নেই সেই প্রথম প্রেমের মতো
অনুভূতি। খুব ছোটবেলায় সে এক রাতে কোষা নৌকা নিয়ে যখন লেকের পানিতে মাছ ধরছিল,
শিলা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে নৌকাকে উল্টো করে আশ্রয় নিয়েছিল নৌকার নিচে,
আজ নিজের জীবনের এই করাল গ্রাসে আশ্রয় নিতে পারছে না কোথাও আমাদের
সহকারী মাঝি বিজয় চাকমা।
#দ্বিতীয়_দিন
ভোর পাঁচটায় উঠে ফজরের সালাত আদায়
করে নিলাম। ছটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য ধূপপানির
উদ্দেশ্যে। ছটার মধ্যেই আমরা সবাই তৈরী হয়ে হোটেলে অর্ডার করে রাখা বিরিয়ানির
প্যাকেট নিয়ে বোটে উঠলাম। অসুস্থতার জন্যে আমাদের একজন হোটেলেই থেকে গেল। ঠিক ভোর
সাড়ে ছটার দিকে বোট ছেড়ে দিল। কিছুদূর গিয়ে আমরা সেনা সদর ক্যাম্পে NID জমা দিয়ে ধূপপানি ট্রেইল এর অনুমতি নিতে গেলাম। আর্মি
ক্যাম্প থেকে বোট যাত্রা করল উলুছড়ির উদ্দেশ্যে, প্রায় ঘন্টা
দেড়েক এর পথ। সকাল সকাল লেকের অপরূপ প্রকৃতি দেখে মনটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল-“এমন দেশটি
কোথাও খুজে পাবে না’ক তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার
জন্মভূমি।” সাথে আনা বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে দেখলাম, শুটকি
ভর্তা দিয়ে মোটা জুম চালে মুরগির বিরিয়ানি। এখানের রীতিনীতি নাকি এমনই, মোটা চালেই বিরিয়ানি হয়। খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ পর রোদের তেজে বোটের উপর
বসতে কষ্ট হচ্ছিল, আবার গতদিনের ক্লান্তিতে প্রচুর ঘুম
পাচ্ছিল। বোটের গলুই এর কাছের একটু ঘুমিয়ে নিলাম, পাশেই
ইঞ্জিনের কর্কট শব্দ। যদিও ঘুমের কাছে এই শব্দ কিছুই না। হঠাৎ এডমিন রুপম ভাইয়ের
হাঁকডাকে ঘুম ভাঙল, একটু দূরেই দেখি আরেকটা আর্মি ক্যাম্প।
এই “অলিখিয়াং আর্মি ক্যাম্প” আমাদের যাত্রাপথের সর্বশেষ আর্মি ক্যাম্প। যথারীতি
নিয়মকাণুন মেনে অনুমতি নিয়ে বোট ছাড়ল আর দশ মিনিট পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম উলুছড়ি
ঘাটে।
ঘাটে নেমেই গাইড নিলাম সাথে আমরা, আজ আমাদের গাইড মিলন দাদা। এই এলাকায় সব তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতিদের
বসবাস, আমাদের গাইড মিলন দাদা খুব মিশুক আর বড় মনের মানুষ
ছিলেন। আসলে পাহাড়ী এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা খুবই সাদাসিদে, আমাদের মতো এতোটা কূটকৌশল নিয়ে চলেনা তারা। এতো দুর্গম এলাকায় হাজারো
নাগরিক সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত থাকার পরও তাদের এতটুকুও অভিযোগ নেই। দুটো খেয়ে
পড়ে নিজেদের মতো বেঁচে থাকার মধ্যেই তাদের প্রকৃত সুখ নিহিত, আর আমাদের শহুরে জীবনে যেন চাহিদার শেষ নেই।
আমার হাতে থাকা ফিট ব্যান্ড এর Walking Workout চালু করে দিলাম, পাহাড়ি
ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা দুএকটি জুম ক্ষেত পেরোলাম। আজকের ট্রেকিং
খুব কষ্টকর হচ্ছে, পথে কোন ঝিরি নেই, মাথার
উপর সূর্যের তেজ বেড়েই চলেছে। চলতে চলতে প্রায় মিনিট বিশেক পর একটা ঝিরির সন্ধান
পেলাম। আমাদের গাইড মিলন দাদা বললেন এই ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে গেলে হাতিমারা ঝর্না পড়বে,
কিন্তু এই হাতিমারা ঝর্নায় যাবার পথ খুব কঠিন এবং মৃত্যুঝুঁকি আছে
বলে এই পথে ট্রেকিং নিষিদ্ধ। ঝিরি থেকে উঠে আমরা একটা পাহাড়ের পথ ধরলাম, এরকম উঁচুনিচু আরো তিনটে পাহাড় পেরোতে হবে। প্রথম পাহাড়টি পেরিয়ে যেতেই
মিলন দাদা পাহাড়ী ডুমুর ফল পেড়ে খাওয়ালেন আমাদের। এই ঘন জঙ্গলে এসে পাহাড়ি ফল খেয়ে
কিছুটা তৃপ্তি অনুভব হচ্ছিল, অথচ প্রচন্ড গরমে আমরা সবাই
ঘেমে নেয়ে একাকার। এই ট্রেইলে কোন ছোটখাটো ঝর্না নেই যে গা-টা অন্তত ভিজিয়ে নেব।
ডুমুর ফল খাওয়া শেষে আমরা আবার চলা শুরু করলাম। তৃতীয় পাহাড়টি অতিক্রম করে আমরা
সামনের পাঁচজন প্রচন্ড হাঁপিয়ে পড়েছি, বাকি সদস্যরা আমাদের
থেকে অনেক পেছনে পড়ে গেছেন যাদেরকে গাইড করে নিয়ে আসছেন এডমিন রুপম ভাই, যিনি আগেও আরেকবার এসেছিলেন এখানে।
বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করা আর কিছুটা
জিরিয়ে নিতে বসলাম আমরা। মিলন দাদার হাতে থাকা পানির বোতল থেকে সবাই পানি পান করে
নিলাম। আমার হাতে থাকা ফিটব্যান্ড এ দেখলাম ইতোমধ্যেই ৫৪ মিনিট ধরে ট্রেকিং করছি
আমরা, অতিক্রম করেছি ১.৮ মাইল। প্রায় ৩ কিলোমিটার
পথ, আরো প্রায় দেড় কিলোর মতো পথ আছে। টিমের বাকি সদস্যরা এসে
পৌছালে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম, এই শেষ পাহাড়টি অতিক্রম
করলেই ধূপপানি পাড়া…আর এরপর সেই কাঙ্খিত ধূপপানি ঝর্না। পাহাড়ি জুম ক্ষেত আর মাঝে
মাঝে ছোট ছোট সাঁকো পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ধূপপানি পাড়ায়, পাড়ায়
ঢুকতেই চোখে পড়ল কিছু তঞ্চঙ্গ্যা শিশু-কিশোর গাছের নিচে পাহাড়ী ফলমূল আর সবজির
পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আমরা তাদের সাথে বেশ কিছু ছবি তুললাম আর কিছুদূর গিয়ে পাড়ার
শেষ দোকানটিতে নাস্তা করে নিলাম। প্রায় চার কিলো পথ ট্রেকিং করে এসে আমার শত
ক্লান্তি মুছে গেল এই দোকানের চা খেয়ে, কেননা আমি বরাবরই
চায়ের নেশায় আসক্ত। আবারো সতেজ হয়ে উঠলাম পুরোদমে। এরপর আমরা অগ্রগামী ক’জন মিলন
দাদাকে নিয়ে চললাম ঝর্নার উদ্দেশ্যে। খুব খাড়া পাহাড় বেয়ে নামার এই পথটুকু খুবই
বিপজ্জনক, ধীরে ধীরে আমরা সবাই নিচে নেমে ঝিরিপথের দেখা
পেলাম। এই ঝিরিপথ পেরিয়ে একটা ছোট পাথরে ঢাকা খুম পেরোতেই দেখা মিলল আমাদের
প্রেয়সী- “ধূপপানির”। হাতে থাকা ব্যান্ডে দেখে নিলাম সময় লেগেছে দেড় ঘন্টা,
অতিক্রম করেছি প্রায় ৫ কিলো পথ। ভরা যৌবনে প্রেয়সীর রূপ দেখলে ইচ্ছে
করবে এখানেই সংসার পাতি। পানি কম থাকলেও বরাবরের মত এসেছি যখন উপভোগ করে তো যেতেই
হবে। আমাদের দলের মিসবাহ নামের এক সদস্য খুব প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে একটা বিশেষ আসনে
ঝর্নার ওই খোপটাতে ধ্যানে বসে ছবি তুলবে, তার দেখাদেখি আমরা
সবাই একে একে ছবি তুললাম।
আমাদের দলের বাকি সদস্যরা এলে পড়ে
সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম। আমরা কজন নিচে নেমে এসে নিচ থেকে প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, এরই মধ্যেই হঠাৎ
সাপ-সাপ করে চিৎকার চেচামেচি। আমার ঠিক কিছুদূর সামনেই ঝর্নার পাথর বেয়ে উঠার
চেষ্টা করছে একটা সবুজ বোড়া সাপ, ইংরেজিতে যাকে বলে গ্রীন
পিট ভাইপার…এর তিনকোণা চ্যাপ্টা মাথা আর সতেজ পাতার মতো সবুজ রঙ দেখেই চেনা যায়।
আশেপাশের অনেকেই দূরে সরে গেল, অনেকেই বলছিল “মারো, সাপটাকে মারো”। যেহেতু আমি কাছেই ছিলাম ত্বরিত গতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে
নিলাম- আমরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছি, তাই প্রকৃতির কোন ক্ষতি
করা যাবেনা। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে তুলে নিয়ে সাপটাকে ফেললাম একটা পাথুরে খোপের ভেতর,
মোটামুটি শান্তই ছিল সাপটি। হাতে থাকা ক্যামেরায় কয়েকটা ছবিও তুলে
নিলাম সবুজ সুন্দরীর, অনেক্ষণ পর শাহজাহান ভাই বললেন… “উপর
থেকে পড়ছে সাপটা।”
ঝর্ণায় ইচ্ছেমতো দাপাদাপি শেষে ফেরার
পথে গ্রামের সেই দোকানে চলল পাহাড়ি মরিচ দিয়ে স্পেশাল ঝালমুড়ি পার্টি, ঝালে আমার তো যায় যায় অবস্থা। পাহাড়ের বুক চিরে ঝিরি ঝিরি
বৃষ্টি নামছিল, বেশি বৃষ্টি হলে পরে ফেরার পথটা কঠিন হয়ে
যাবে আমাদের জন্যে। আর তাই বেলা দুইটার দিকে আমরা আবার আমাদের বোটের উদ্দেশ্যে
যাত্রা শুরু করলাম। উঁচু নিচু কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে আমরা অগ্রগামী ক’জন বেশ দ্রুতই
এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সামনে ছিলেন সিনিয়র ট্রাভেলার শাহজাহান
ভাই। বাকিরা গাইড মিলন দাদার সাথে আসছিল। পথিমধ্যে চোখে পড়ল পাহাড়ি পাকা কলার পসরা
সাজিয়ে বসে আছেন এক নারী, আমরা কলা কিনে খেলাম। শাহজাহান ভাই
অতি আবেগী হয়ে এক কাধি কাঁচা কলাও কিনে নিলেন, যখন কলার কাধি
কাঁধে নিয়ে হাটছিলেন তখন অবশ্য টের পাচ্ছিলেন মজা। একঘন্টার ট্রেকিং শেষে আমরা
বোটে ফিরে এলাম, এরপর খালের পানিতে নেমে গোছল সেরে নিয়ে
বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আধঘন্টা পর দলের বাকি সবাই এসে পৌছালে আমাদের মাঝি
ইউসুফ ভাই বোট চালু করে দেন। বরাবরের মতো ফেরার এই সময়টুকুতে আমার কেমন এক খারাপ
লাগা কাজ করে, যেন বহু মূল্যবান কিছু স্মৃতি ফেলে যাচ্ছি এই
গহীন অরণ্যে। ফেরার পথে আর্মি ক্যাম্পগুলোতে জানিয়ে বিলাইছড়ি এসে আমাদের অসুস্থ
সদস্যটিকে তুলে নিলাম বোটে।
সন্ধ্যা নেমেছে বিলাইছড়িতে, আর আমরা যাত্রা করছি কাপ্তাই ঘাটের উদ্দেশ্যে। আবার কখনো আসা
হবে কিনা জানা নেই, তবে খুব প্রাণপণে অনুভব করব এই পাহাড়ি
সাদাসিদে জীবন আর এই মানুষগুলোকে। যেতে যেতে কাপ্তাই লেক ছেয়ে যায় ঘোর অন্ধকারে,
এই অন্ধকার কেটে আমাদের বোট তরতর করে এগিয়ে চলছে সামনে। রাতের
আঁধারে লেকের বুক চিরে বয়ে চলা কোন এক বোটের উপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখব- এ কখনো
কল্পনাতেও ছিলনা, স্বপ্নের মতো অতিবাহিত হচ্ছিল সময়গুলো।
ফেরার পথে সর্বশেষ গাছকাটা আর্মি ক্যাম্পে বোট থামল আমাদের সহি-সালামতে ফিরে আসাটা
কনফার্ম করার জন্যে। এরপর রাত আটটায় কাপ্তাই জেটি ঘাটে গিয়ে থামল আমাদের বোট। এরপর
জেটি ঘাট থেকে সিএনজি করে ফিরতি পথে বাড়ির পথ ধরা। আল্লাহ্র দরবারে অশেষ শুকরিয়া
কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই বাড়ি ফিরে আসার জন্যে।





No comments:
Post a Comment