Friday, November 27, 2020

জমিদারবাড়িতে হানা



শিরোনাম দেখেই চমকে গেলেন? ভাবছেন, আমি আবার কবে থেকে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা সিরিজ লেখা শুরু করলাম! সত্য বলতে কি আজকে এক রকম হানাই দিতে হলো জমিদারবাড়িতে। গাজীপুর আসার পর থেকেই কাজের ব্যাস্ততায় ঘোরাঘুরি একদমই বন্ধ হয়ে গেল, ঠিক যেন দম আটকে আসছিল...ন'টা থেকে ছ'টার জীবন। ইচ্ছে করলেই বেড়িয়ে পড়তে পারছিলাম না। এমনিতে চন্দ্রায় আসার পর আশেপাশে প্রচুর হাটাহাটি হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, ম্যাপে দেখেলাম কাছেই দু-দুটি জমিদারবাড়ি আছেঃ


১.বলিয়াদি জমিদারবাড়ি 

২.শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ি


আর তাই আজকের এই ছুটির দিনটিকেই বেছে নিলাম জমিদারবাড়িতে হানা দেয়ার জন্যে। সাথে ছিল কলিগ  Chayan Mistry , মিস্ত্রী সম্পর্কে যদি কিছু লিখার হয় তবে লিখব খুবই আন্তরিক এবং আমার মতোই প্রযুক্তি নিয়ে পাগল। যাই হোক, জুমার নামাজ শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়েদেয়ে দুপুর তিনটায় বেরোলাম দুজনে, বাড়ইপাড়া হয়ে রিকসায় গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বলিয়াদি যাওয়ার যাবে। 


যেতে যেতে বলিয়াদী জমিদারবাড়ি সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক...

গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বলিয়াদী ইউনিয়নে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলিয়াদী জমিদার বাড়ী (Baliadi Jamider Bari) অবস্থিত। ১৬১২ খৃস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান বলে প্রতিষ্ঠিত বলিয়াদী এস্টেটের প্রথম কর্ণধর খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) বংশধর কুতুব উদ্দিন সিদ্দিকীর পুত্র সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী। বর্তমান বলিয়াদী এস্টেটের মোতওয়াল্লী চৌধুরী তানভীর আহম্মদ সিদ্দিকী ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) ৩৭তম বংশধর। বলিয়াদী জমিদার বাড়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত কোন সম্পত্তি নয় এবং জমিদারদের বংশধরাই বর্তমানে এই বাড়ির মালিক। 


যেতে যেতে আশপাশের গ্রামীণ সৌন্দর্যে মনটা অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। ধলেশ্বরীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা এই সুবিশাল জনপদের অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কবিতার প্রিয় ক'টি লাইন...

"যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে অপরাজিতার মতো নীল হ’য়ে- আরো নীল-আরো নীল হ’য়েআমি যে দেখিতে চাই;- সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে ল’য়ে কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে,আমি যে দেখিতে চাই;- আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাসে।"

প্রায় মিনিট ত্রিশেক পর আমরা এসে পৌঁছলাম বলিয়াদি জমিদারবাড়ির সামনে, এই যাত্রায় গুগল ম্যাপই ছিল আমাদের একমাত্র ভরশা। রিকশা থেকে নেমে হেঁটে চললাম ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর খোঁজে। কিছুদূর গিয়েই পেলাম সুবিশাল লন, সামনেই পড়ল বলিয়াদী এস্টেট এই সুবিশাল ফটক আর একপাশে মসজিদ। আরেহ, এই তো সেই জীবনানন্দের কবিতার ঘাষ...আমি যে বসিতে চাই বাংলার ঘাষে!  খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করার পর জানতে পারলাম দর্শনার্থীদের জন্যে জমিদারবাড়ি উন্মুক্ত নয়। যাহ, সব আশায় গুড়েবালি...আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল, যেহেতু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই জমিদারবাড়ি অধিগ্রহণ করেনি তাই এখানে কেবল বর্তমান এস্টেট এর মালিকের হুকুমই চলবে। তারপরও আশাহত না হয়ে এদিক ওদিক হাটাহাটি করছিলাম, যদি কোন সুযোগ মেলে আরকি। কিছুক্ষণ পর দেখলাম জনা-সাতেক ছেলেপিলে মূল ফটক টপকে ভেতরে ঢুকছে। আমি তখন মিস্ত্রীকে বললাম...


- কি ভাই, হবে নাকি? দেয়াল টপকে জমিদারবাড়ি তে হানা? 

- আরে না না ভাই, আরো কিছুক্ষণ দেখি।

এরই মধ্যে বাইক নিয়ে তিনজনের একটা ছোট গ্রুপ আসল। আমরাও অনেক আশা নিয়ে তাদের সাথে গেটের সামনে গেলাম। ওই গ্রুপের এক ভাই খানিকক্ষণ হাঁকডাক করলে পরে ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলো, কিন্তু আমাদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও গেট খোলা যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়ে চলে গেল। মনে মনে জমিদার আর তার বংশধরের গুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলছিলাম আর ঠিক করে নিলাম ভেতরে ঢুকবই ঢুকব। আশপাশটা ভালভাবে দেখে পেছনের ফটকের দিকের সীমানা পাঁচিল এর নিচে দেখলাম মাটি অনেকটা দেবে গিয়ে বড়সড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে...যে গর্ত দিয়ে সহজেই ঢুকে যাওয়া যাবে।

গ্রামের সিঁধ কাটা চোরের মতো অবস্থা আমাদের, একে একে মিস্ত্রী আর আমি ঢুকে পড়লাম পাঁচিলের নিচের গর্ত দিয়ে, বেশ একটা থ্রিল থ্রিল ফিল এসে গেল। বিকেল বেলায় বিশাল দীঘির পাড় ঘেষে থাকা ঘন গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছিলাম আমরা, কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। মিনিট দুয়েক হেঁটেই জমিদারবাড়ি পেছনের খোলা ফটক দিয়ে ঢুকে পড়লাম, কিন্তু ভেতরা থাকা নিরাপত্তা প্রহরীর চোখে পড়ে গেলাম। প্রহরী ব্যাটা হাঁকডাক করতে করতে বাড়ির আশেপাশে ঘুরে দুয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। 

যদিও ফটক টপকে ঢুকা ওই জনা-সাতেক এর দল ভেতরে এসে আড্ডা দিচ্ছিল, বুঝতে পারলাম.. এরা এলাকার ছেলেপিলে... তাই এদের প্রহরী কিছুই বলছে না। যাইহোক, ঢুকব বলে ঠিক করেছিলাম...ঢুকে ছাড়ছি। এরপর প্রহরী প্রধান ফটক খুলে দিলে পরে আমরা বেরিয়ে আসি।




বেরিয়ে এসে আমাদের মনটা ঠিক ভরল না, যদিও মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন খুব কাছ থেকে দেখে কিছুটা প্রাপ্তি কাজ করছিল...কিন্তু বাড়ির ভেতর ঢুকে কামরাগুলো দেখতে না পারার আফসোস থেকেই গেল। ওদিকে কাছেই আছে শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ি। ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করলাম এরপর। কিন্তু এখানে এসেও দেখি একই অবস্থা, ভেতরে ঢুকতে দেবে না। পাঁচিলটা বেশ মজবুত আর আশেপাশেও কোন ফাঁক-ফোকর পেলাম না, বাইরে থেকে দু-চারখানা ছবি তুলে নিয়ে আবার চন্দ্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।


No comments:

Post a Comment

সাগরকন্যা সন্দ্বীপ

চারপাশে সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বেষ্টিত কোন এক দ্বীপে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে খুব ইচ্ছে করছিল, কম খরচে এই ইচ্ছে পূরণের জন্যে লক্ষ্য হতে পারে ...