"Light a campfire and everyone's a storyteller"
লেখক John geddes এর এই উক্তির মধ্যে ক্যাম্পিং আর গল্পের আসরের মধুর সম্পর্ক কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। শীতকালের প্রকৃত স্বাধ নিতে চাইলে তাবুবাস বা ক্যাম্পিং এর কোন বিকল্প নেই আর এই তাবুবাসের অন্যতম আকর্ষণ ক্যাম্প ফায়ার কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা গল্পের ঝুলি থেকেই কিছু লিখতে বসা আজ। "ক্যাম্পিং" শব্দটার সাথে প্রকৃতির আদিম এক অনুভূতি জড়িত। কয়েকজন মিলে নিখাদ প্রাকৃতিক পরিবেশে তাবু গেঁড়ে আড্ডা মুখর রাত্রিযাপন, নানারকম পাখি, অজানা পোকার শব্দ, গাছগাছালির ঘোর নীরবতা কিংবা কুয়াশার টপ টপ শব্দ মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। নগরের যান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে নৈস্বর্গিক পরিবেশে একটি রাত কাটানোর মুহূর্তগুলো দেয় অনাগত দিনে প্রাণবন্ত থাকার রসদ।
কলেজে যখন বি.এন.সি.সি করতাম, তখন কর্নফুলী রেজিমেন্ট এর এয়ার উইং থেকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একখানা সাতদিনের ক্যাম্পিং করা হয়েছিল। প্রায় ন'বছর আগে সেই ছিল আমার প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা। শহুরে জীবনে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে বিজয় দিবসের ছুটিকে কেন্দ্র করে আরেকখানা ক্যাম্পিং ট্যুর এর স্বাধ নিয়ে নিলাম Share Basis Team এর বর্ষপূর্তি আয়োজনে।
১৭ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার....ঢাকা থেকে আসার পর থেকে বন্ধু ও ছোট ভাইদের সাথে দেখা করতে সকাল থেকে জিইসি ছিলাম। যোহরের সালাত ও দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর রওনা দিলাম কাপ্তাই রাস্তার মাথা'র উদ্দেশ্যে। খানিকটা জ্যাম থাকার কারণে কাটায় কাটায় সাড়ে তিনটায় পৌঁছলাম রাস্তার মাথা। এরপর ট্যুর এডমিন রুপম ভাইয়ের সাথে দেখা, আমি আসার ঠিক দু'মিনিট আগেই নাকি এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটে গেছে যার রেশ ছিল তাবুতে ঘুমাতে যাবার আগ মুহূর্তে। যাই হোক, খানিক বাদেই আরেক এডমিন ফারজানা আপু চলে এলেন। এরপর আমরা সিএনজি তে উঠে পড়লাম....আবার সেই ম্যারাথন সিএনজি জার্নি। এক-দেড় ঘন্টার রাস্তার মাথা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত এই সিএনজি ভ্রমণে আমার বরাবরই হাত-পা ব্যাথা হয়ে যায়...তার উপর এমন ঘুম আসে। প্রায় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কাপ্তাই প্রশান্তি পার্কের সামনে এসে থামলো আমাদের গাড়ি, সন্ধ্যে নামতে আর কিছুটা সময় বাকি। পার্কে ঢুকতেই মনটা জুড়িয়ে গেল, কর্নফুলীর পাড় ঘেষে গড়ে উঠা এই পার্ক ও ক্যাম্পিং স্পটের প্রায় পুরোটাই ঘন গাছ-গাছালিতে ভরপুর। সাথে সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলের লেক, কায়াক, মাচা, কুঁড়েঘর, দোলনা, বাগান আর হ্যামক যেন একটা জম্পেশ ক্যাম্পিং এর পরিবেশ সাজিয়ে বসে আছে ভ্রমণপিয়াসীদের জন্যে।
এদিক ওদিক একটু হাটাহাটি করেই একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিলাম, সামনেই কর্মব্যস্ত দিনগুলোর জন্যে ভালোই রশদ জোগাড় হবে এই ট্যুর থেকে। এরপর পার্কের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিলাম। নামাজ শেষে আমাদের ক্যাম্পিং স্পট এ এসে দেখলাম ইতোমধ্যেই গ্রুপের অধিকাংশ এসে পড়েছে, হাতে হাত লাগিয়ে একে একে তাবু বসানো শুরু করে দিলাম। প্রায় সত্তর জন মানুষের জন্যে তাবু ভাড়া করে আনা হয়েছে, তাই একের পর এক তাবু বসাতে হচ্ছিল। রুপম ভাই, আমি আর সাদমান মিলে মোটামুটি বেশ ক'টা তাবু খাটিয়ে নিলাম। এরপর নাস্তা, ডিনার আর ব্রেকফাস্ট এর কুপন বিলি করা হলো....বরাবরের মতো কুপন থেকে বেশ কিছু আকর্ষণীয় পুরস্কারের বন্দোবস্ত ছিল এবারের ট্যুরেও। সন্ধ্যার নাস্তা শেষ করে বাকি তাবুগুলো বসানোর কাজ শেষ করলাম। এরপর সেই সাজেক ট্যুরের চিঠির আবিষ্কারক সৈকত ভাইয়ের সাথে দেখা, সৈকত ভাই আর মিস্টার রিলাস্ক ট্যুর মাসুম ভাইয়ের সাথে বেশ ক্ষাণিক্ষণ গল্প-আড্ডা চলল। এবারের আড্ডায় সৈকত ভাইয়ের নতুন এম মতামত প্রবর্তন করলেন....
"বিয়ে হচ্ছে নাকি ওয়াশ রুমের মতো, যারা বাইরে আছে তারা ভেতরে আসতে চায়....আর যারা ভেতরে আছে তারা বেরিয়ে আসতে চায়"
আমার অধিকাংশ ট্যুরের ট্রেকিং পার্টনার ছোটভাই মীর এরই মধ্যে তার জনা-সাতেক এর টিম নিয়ে উপস্তিত হলো। আগের বিভিন্ন ট্যুরের পরিচিত ভাইদের সাথে দেখা হচ্ছিল, আবার নতুন কিছু মুখের সাথেও পরিচিত হচ্ছিলাম। সত্যিই এ যেন আরো এক পরিবার, ভ্রমণেই যাদের নেশা ভ্রমণেই যাদের বন্ধুত্ব। রাত বাড়ার সাথে সাথে একে একে সবাই আসা শুরু করল পার্কে, আরো দুয়েকটা গ্রুপের ক্যাম্পিং ছিল আশেপাশে। লেকের পাড়ে মাচায় একটা গ্রুপ বিশেষ একটা খেলার আয়োজন করেছিল, ওটা দেখতে দেখতেই হঠাৎ এক পরিচিত কণ্ঠস্বর..
-আরেহ, সানি না? কেমন আছ?
-এইত ভালো আপু, আইমুন আপু না?
-হ্যাঁ, কাদের সাথে আসছ?
-এইতো, আমাদের একটা ট্যুর গ্রুপের বর্ষপূর্তি ক্যাম্পিং।
-ভালোই, আমি তেমন একটা ট্যুর দেইনা। এটাই প্রথম আউটিং।
আইমুন আপু ভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্ট এর সিনিয়র। ভার্সিটি তে রোবোটিক্স এর কাজের সূত্রে আপুর সাথে পরিচয়। নিচ থেকে উপরে উঠে আসতেই মীর আমাকে প্রশ্ন করল
-কি ভাই, কবে থেকে এ? আপনারে তো ভালোমানুষ ভাবছিলাম।
-আরেহ, ভার্সিটির সিনিয়র আপু....হা হা হা।
রাত নটার দিকে আমরা সবাই রাতের খাবার সেরে নিলাম, এরপর যে যার মতো এদিক ওদিক একটু হাটাহাটি। ঠিক এই সময়টাতে আইমুন আপুদের গ্রুপ থেকে জমে উঠল গানের আসর। ক্ষণিকের জন্য ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে যেন ফিরে গেলাম। গানর আসর শেষে আমাদের গ্রুপ থেকে হলো আপুদের মিউজিকাল পিলো-পাসিং আর ভাইদের জন্যে মোরগ লড়াই। মোরগ লড়াই আসতেই আমার স্কুল লাইফের কথা মনে পড়ে গেল। একবার ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় সাহস করে মোরগ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলাম... ক্লাস সেভেনের এক সিনিয়র এমন ধাক্কা দিয়েছিল মুখ থুবড়ে পড়ে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছিলাম।সেই থেকে এই ইভেন্ট এর দূরে দূরে থাকি, এবারও ব্যাতিক্রম হলো না। মোরগ লড়াই এ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভাইকে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বেশ ক'বার মোরগের ডাক দিতে হলো।
এরপর শুরু হলো কুপনের পুরস্কার বিতরণী আর বার্বি কিউ। আমরা ক'জন গিয়ে কাঠ নিয়ে ক্যাম্প ফায়ারের বন্দোবস্ত করলাম। শীত যখন আমাদের উপর জেঁকে বসছিল ঠিক তখনই এই আগুনের উত্তাপে ক্যাম্প কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। আগুনের চারপাশে গোল করে জমে উঠল গল্প-আড্ডার আসর। এর ফাঁকে ফাঁকে কুপনের পুরস্কার বিতরণ করা হচ্ছিল মঞ্চে... মজার মজার সব পুরস্কারে ভরপুর ছিল মঞ্চ। প্রথম পুরস্কার ছিল একটা তাবু, দ্বিতীয় একটি হ্যামক....এই দুটোই ছিল সর্বমোট একুশ টি পুরস্কারের মূল আকর্ষণ। কিছু সময় পরপর আগুনে কেরোসিন ঢেলে বেশ আগুনের ফুলকির আলোতে আলোকিত করছিলাম চারপাশ। আগুনের পাশে বসে বসে ভাবছিলাম ফেলে আসা দিনগুলোর কথা....স্মৃতির পাতায় কতো সুখস্মৃতি এভাবে কাঠের মতো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আবার সেই আগুনেরই উত্তাপ পেয়ে জেগেছে হাজারো নতুন স্বপ্ন। এভাবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার কুপনের নাম্বারের ডাক শুনতে পেলাম, নবম পুরস্কার হিসেবে পেলাম একটা মোবাইল এর ওয়াটার প্রটেকটর ব্যাগ।
এভাবে একে একে কুপন তোলা হচ্ছিল ও পুরস্কার বিতরণ পর্ব চলছিল। শাহজাহান ভাই পেলেন দ্বিতীয় পুরষ্কায় হ্যামক আর কুমিল্লা থেকে আসা সুজন ভাই জিতে নিলেন আকর্ষণীয় একটি তাবু। পুরস্কার বিতরণী শেষ হতে হতে রাত তিনটে বেজে গেছে প্রায়...গল্প-আড্ডা আর মজায় সমগুলো খুব দ্রুতই কেটে যাচ্ছিল।এরপর পরোটা আর বার্বি কিউ দিয়ে চলল লেট নাইট আহার... ডিনার যেহেতু আগেই করেছি...তাই একে লেট নাইট আহার বলাই সাজে। আহার শেষে একে একে যে যার তাবুতে ঘুমানোর আয়োজন করছিলাম। আমার তাবুমেট ছিলেন সৈকত ভাই আর মাছুম ভাই। সৈকত ভাই পুরো কম্বল নিয়ে এসেছেন... যদিও চাদর ছিল আমাদের কাছে। অবশ্য কম্বলের উষ্ণতা পেয়ে ঘুমটা ভালোই হয়েছে, তাবুর উপর টপ টপ করে পড়তে থাকা শিশিরের শব্দ, ঘন জঙ্গলের শুনশান নীরবতা নিয়ে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালাম।
খানিক বাদেই তীব্র শব্দে জেগে উঠি, প্রথমে ভেবেছিলাম কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার তাবুর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। পরে আবিষ্কার করলাম মাছুম ভাই তীব্র শব্দে নাক ডাকছেন, যা সত্যিই এক ভয়ঙ্কর বুনো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অনেক কষ্টে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম ভাঙার পর দেখি তাবুতে কেবল আমি আর সৈকত ভাই...মাসুম ভাই গায়েব 😄😄। তাবু থেকে দুজনে মাথা বের করি দেখি অনেক কুয়াশা আশেপাশে...সৈকত ভাই আশেপাশে এক চক্কর মেরে এসে বললেন..."অনেক কুয়াশা, ছবি ভালো হবেনা...আরেকটু ঘুমাই নেই"। মীর এসে ডাকাডাকি করল, কিন্তু রাতে ঠিকঠাক ঘুম না হওয়ায় আরেকটু ঘুমিয়ে নিলাম। এরপর সকাল সাতটায় উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমি আর সৈকত ভাই মিলে কিছু ছবি মুঠোফোনে বন্দী করে নিলাম। এরপর সবাই মিলে সকালের নাস্তা শেষ করে গ্রুপ ফটো তুলে যার যার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।









No comments:
Post a Comment