মহামারীর টানা লকডাউনে গণহারে সবাই
যখন বিয়ে করতে ব্যাস্ত ঠিক তখন টানা ছয়মাস ঘরবন্দী থেকে কোথাও ট্যুর দিতে না পেরে
অতিষ্ঠ আমার মতো হাজারো ভ্রমণপিপাসুদের মন। একশ্রেণী যেমন ভাবছে... বাঁচামরার ঠিক
নাই বিয়েটা করেই নেই, তেমনি আরেক শ্রেণী
ভাবছে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির অদেখা অপার সৌন্দর্য উপভোগ করে নেই। একেকটা ট্যুর শেষে
আমরা বেঁচে থাকার যেসব রশদ জোগাড় করি,সেই রশদের সাথে
অন্যকিছুর তুলনা হয় না। ট্যুরিস্ট স্পটগুলো খুলে দিতেই তাই ভ্রমণপিয়াসীদের উপচে
পড়া ঢল। আগে ট্যুর শেষে তুলে রাখা ছবিগুলো
স্মৃতি হয়ে থাকতো, আর এখন ছবির পাশাপাশি প্রতিটা ট্যুর শেষে
এই স্পেশাল ভ্রমণ কাহিনী লিখা...যাতে করে আদ্যোপান্ত পড়ে আবারো ফিরে যেতে পারি
মুহূর্তগুলিতে। আগের লেখা ভ্রমণকাহিনী পড়ে অনেকেই একে রচনা বলে আখ্যা দিয়েছেন,
একটু বড় হলেও আশা করি পুরোটা পড়ে নিরাশ হবেন না।
কাহিনীর শুরু আমার দেখা একটা স্বপ্ন
দিয়ে। একদিন রাতে স্বপ্নে দেখলাম সাদা মেঘের উপর উড়ে বেড়াচ্ছে নীল শাড়ি পরা এক
পরী...আর আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম
- "আমাকে নিয়ে যাবে ওই মেঘের
রাজ্যে?"
উত্তরে সে পরী 'না' বলে মুখ ভেংচিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রহস্যময়ী পরী অদৃশ্য হয়ে গেলেও আমি মনস্থির করে ফেললাম মেঘের রাজ্যে যাবোই যাবো।
হঠাৎ করে Share Basis Tour গ্রুপ থেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেক
ট্যুরের ঘোষণা এলো, ব্যাস কনফার্ম করে পঁচিশ তারিখ ভোরেই
আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বায়জিদ বাস কাউন্টার এর উদ্দেশ্যে।
শহরের আকাশে ছিল কালো মেঘের আনাগোনা, সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে সবসময় ট্যুর দেয়া
হয়ে উঠেনা, তার উপর যাচ্ছি মেঘের রাজ্যে...এ তো সোনায়
সোহাগা। শান্তি পরিবহন এর বাসে উঠলেও যাত্রাপথের নানা অশান্তি উঁকি মেরে বসে ছিল
আমাদের জন্যে। অক্সিজেন বাস কাউন্টার থেকে বাকিসব যাত্রীদের নিয়ে সকাল সাড়ে সাতটায়
আমাদের বাস রওনা দিল খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ফতেয়াবাদ, হাটহাজারী,
ফটিকছড়ি পেরিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর বাস যাত্রাবিরতি দিল মানিকছড়ি
বাজারে। সকালের নাস্তা শেষ করে বাসে উঠে আরো দেড় ঘন্টার বাসভ্রমণ। মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়ে বাস
ঢুকল খাগড়াছড়ি। কিছুদূর গিয়ে আমরা নেমে পড়লাম আলুটিলা পর্যটন কমপ্লেক্সে। টিকিট
কেটে কিছুদূর গিয়েই মুগ্ধ হই বৃষ্টিস্নাত আকাশে মেঘের ভেলা দেখে। খুব কাছ থেকেই
মেঘের আনাগোনা উপভোগ করছিলাম, সাথে টিপটিপ বৃষ্টি। গুটিকয়েক
ছবি তুলে আমি, মীর আর আশরাফ চললাম গুহার পথে। আমাদের ২২ জনের
টিমের চার-পাঁচজন এলো আলাদা গ্রুপে, বাকিরা সবাই গল্প,আড্ডা,ছবি তোলা আর মেঘ ও বৃষ্টি উপভোগে ব্যাস্ত। ট্যুর
এডমিন রুপম ভাই বললেন সামনেই মশাল পাওয়া যাবে...গুহায় খুব অন্ধকার, যাতে ঢুকতে মশাল নিয়ে যাই। হাঁটতে হাঁটতে সামনে পড়ল এক বিশাল অশ্বথ
গাছ…দিনের আলো না থাকলে পুরোপুরি ভূতুড়ে পরিবেশ বলা যেত। আরেকটু হেঁটে সামনে যেতেই
পেলাম গুহায় ঢুকার মুখ, কিন্তু আশেপাশে কোন মশাল বিক্রেতাকে
না দেখে সাহস করে মোবাইলের ফ্লাসলাইটে ভরসা করেই ঢুকে পড়লাম গুহায়। আমাদের চারজনের
টিমকে সামনে থেকে লিড করে যাচ্ছিলাম। অন্ধকারে পথ চলতে আমার কখনোই অস্বস্তিবোধ
হয়না, আমি আশা করছিলাম আরো বেশি কিছু…চিপা-চাপা দিয়ে কষ্ট
করে যেতে হবে কিংবা একঝাক বাদুড়ের দলের দেখা পাবো এমন এডভেঞ্চার কিছু। অবশ্য ভেতরে
এতোটাই অন্ধকার ছিল যে একহাত দূরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, নিচে বয়ে যাচ্ছিল গোড়ালি সমান পানির স্রোত। হাঁটতে হাঁটতে পাঁচ মিনিটের
মধ্যেই আলোর মুখ দেখতে পেলাম আর সবাই মিলে ছবি তুলে গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম।
আলুটিলা গুহা থেকে বেরিয়ে দলের বাকি
সবার সাথে একত্র হয়ে উপরে উঠে এলাম, এরপর
চলে এলো আগে থেকে ভাড়া করে রাখা আমাদের চান্দের গাড়ি দুটি। ১১ জন করে প্রতি গাড়িতে
উঠে আমরা চললাম তারেং পাহাড়ের চূড়ায়। প্রচন্ড গতি নিয়ে আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ে
উঠছিল তখন ছাদের উপরে থাকা আমরা সবাই মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গেলাম অন্য জগতে।
খাগড়াছড়ি শহরের মেঘ আর বৃষ্টিসমেত এক অনন্য দৃশ্য ফুটে উঠছিল আমাদের চোখের সামনে।
গাড়ি থেকে নেমে হালকা হেঁটে তারেং পাহাড়ের চূড়ায় আর্মির হেলিপ্যাড এ পৌঁছলাম আমরা।
এ যেন এক অনন্য দৃশ্য, দূরের ওই নীল-সাদা মেঘগুলি ভেসে
বেড়াচ্ছে তাদের আপন গতিতে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমরা সেই মুহূর্তগুলি মুঠোফোনে বন্দী
করে নিলাম। হঠাৎ মেঘ হেলিপ্যাডের দিকে ধেয়ে এলো আর এক পশলা বৃষ্টি…বৃষ্টি নামতে না
নামতেই সবাই পড়িমরি করে ছুটল গাড়ির দিকে।
তারেং থেকে আবার গাড়িতে চড়ে রওনা
দিলাম হর্টিকালচার পার্ক এর পানে। গাড়ি থামতেই চোখে পড়ল বিশাল এক ফটকে লিখা
-“খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক”। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম সবাই, পার্কটা মোটামুটি ফাঁকা আর নিরিবিলিই ছিল…অন্যান্য স্পট গুলোর
মতো অতটা ভিড় ছিলনা। প্রথমেই একে একে ছবি তুলে নিলাম ঝুলন্ত ব্রিজে, এরপর ব্রিজ পার হয়ে হেঁটে হেঁটে দেখলাম পুরো পার্ক। আশেপাশে রঙবেরঙের
ফুলগাছের সমাহার, বাহারি রঙের ফুলে পার্কটা সত্যিই মোহনীয়
হয়ে উঠেছে। হেঁটে হেঁটে আমরা কয়েকজন চলে আসলাম লাভ পয়েন্টে, যুগলদের
ছবি তোলার জন্য এই পয়েন্ট। কি আর করার, এসেই যখন পড়েছি আমরা
ক’জন সিংগেল পোলাপান কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। উপর থেকে পার্কের সিঁড়ি বেয়ে নিচে
নেমে গেছে, আর নিচেই তৈরী করা হয়েছে ছোট পুলের মতো
জলাধার।

পার্ক থেকে সবাই বেরিয়ে গ্রুপ ফটো
নেয়া হলো, এরপর আবার চান্দের গাড়িতে চড়ে খাগড়াছড়ি
বাজার, বাজারের একটা রেস্টুরেন্টে নেমে আমরা দুপুরের খাবার
সেরে নিলাম। আবার যাত্রা শুরু বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে, বিকেল তিনটার স্কট ধরতে হবে, নয়তো নাকি আর্মি সাজেক
যেতে দিবে না…আবার খাগড়াছড়ি ফিরে আসতে হবে। হাতে আছে প্রায় আড়াই ঘন্টার মতো,
সাঁই সাঁই করে চান্দের গাড়ি ছুটে চলছে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা
বেয়ে। পার্বত্য অঞ্চলগুলো ভ্রমণের এই একটাই আকর্ষণ, তা হচ্ছে
চান্দের গাড়ির ছাদে চড়ে প্রকৃতি দেখা। ঘন্টাখানেক চলতে চলতে আমরা দিঘীনালা পার হয়ে
এলাম। এরপর গাড়ির ছাদ থেকে নেমে আমরা ভেতরে ঢুকে গেলাম, আর্মির
সামনে পড়লে আরেক বিপত্তি বাঁধবে। আরো প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা…রাস্তার অবস্থা খুবই
খারাপ ছিল। বৃষ্টিতে আর নিয়মিত ভারী যানবাহনের চলাচলে রাস্তার খানা-খন্দের সৃষ্টি
হয়েছে। বাঘাইহাট ক্যাম্পের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা, আর
মিনিট বিশেক এর পথ। ঠিক তখনই বাঁধল প্রথম বিপত্তি, লম্বা
গাড়ির জ্যাম… গর্তে ভরা ঢালু আর পিচ্ছিল রাস্তা পেরিয়ে সামনে যেতে বেগ পেতে হচ্ছিল
সামনের গাড়িগুলোর। হঠাৎ গাড়িতে এক তীব্র গর্জন নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল আমাদের
ড্রাইভার নূর আলম। কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ির ছাদে বাড়ি খেলাম, মাথাটা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছিল। নিজেকে সামলিয়ে নিতেই আবিষ্কার করলাম আমরা
ঢালু রাস্তা বেয়ে উপরে উঠে গেছি, গাড়িচালক নূর আলমের
পারফর্মেন্স দেখে সবাই তাকে “পাইলট” উপাধি দিল। এরপর মিনিট পাঁচেক সামনে এগিয়ে
যেতেই আমাদের অন্য গ্রুপ থেকে ফোন এলো, তাদের গাড়ির চাকা সেই
ঢালু রাস্তার পাশের নালায় আটকে গেছে। কিছুতেই উঠানো যাচ্ছেনা, আমাদের সাহায্য প্রয়োজন। ইতোমধ্যেই তিনটা বেজে গেছে প্রায়, স্কট সর্বোচ্চ মিনিট দশেক অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে গিয়ে না পৌঁছলে এতদূর
আসাটাই বৃথা হবে। সবাই দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেল, কেউ বলছিল
সামনে এগিয়ে যেতে…কেউ বলছিল পেছনে গিয়ে ওদের সাহায্য করতে। আর আমাদের ট্যুর এডমিন
রুপম ভাইও যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন এর একটা সমাধান বের করতে। শেষমেশ আমাদের পাইলট
নূর আলম ভাই আরো এক অনন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে বিষ্মিত করলেন, গাড়ি ব্যাক দিলেন তাদের সাহায্য করার জন্যে।
স্পটে পৌঁছে দেখি গাড়ির পেছনের চাকা
খুব বাজেভাবে আটকে গেছে, কিছুতেই উপরে উঠছে
না। আমাদের গাড়ির সাথে দড়ি বেঁধে টানা হলো, আর আমরা কয়েকজন
নালার পাশ থেকে গাড়ি ঠেলে উপরে তোলার চেষ্টা করছিলাম। আল্লাহ্র অশেষ রহমতে গাড়ি
টেনেটুনে নালা থেকে উপরে তোলা গেল, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে
গেছে। সাড়ে তিনটা বেজে গেছে, এতক্ষণে স্কট নিশ্চিত ছেড়ে চলে
গেছে। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম, আমরা যখন
আর্মি ক্যাম্প এসে পৌঁছলাম তখন দেখি একটাও গাড়ি নেই। ধীরে ধীরে আমরা সামনে এগিয়ে
যাচ্ছিলাম, কি আজব ব্যাপার…আর্মি কিছুই বলল না। আমরা ক্যাম্প
ফেলে সামনে এগিয়ে গেলাম, রাস্তার মারাত্মক অবস্থা ও নিয়মিত
যাতায়াতের কারণে আর্মি হয়তো স্কট মিস করলে ফেরত পাঠানোর নীতিমালা শিথীল করেছে। যাক,
বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম আমরা সবাই…আলহামদুলিল্লাহ। কিছুদূর যেতে সামনে
পড়ল একটা ব্রিজ, ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে কাসালং নদী। আরো
কিছুদূর গিয়ে একটা পুলিশ ক্যাম্প সামনে পড়ল, চেকপোস্টে পুলিশের
জিজ্ঞাসাবাদে আমরা আমাদের বিলম্বের কারণ জানালাম। আমাদের পেছনে থাকা অন্য গ্রুপটি
এলে পরে আবার সামনে এগিয়ে চললাম। আরেকটি আর্মি চেকপোস্ট পেরিয়ে যাবার পরই গাড়ি
থামিয়ে সবাই আবার চান্দের গাড়ির ছাদে উঠে পড়লাম। সন্ধ্যা নামতে আরো ঘন্টা খানেক
বাকি, আমাদের গাড়ি পাহাড়ি পথ বেয়ে সামনে এগিয়ে চলছে। দূরের
পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দেখলাম তুলার মতো মেঘ জমাট বেঁধে আছে, এ
যেন এক অপূর্ব দৃশ্য। যতোই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম পাহাড় আর সাদা মেঘের মনোরম
দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছিলাম আর বলতে বাধ্য হচ্ছিলাম…সুবহান-আল্লাহ…আল্লাহু-আকবর। এমন
মনোরম দৃশ্য সমসময় চোখে পড়েনা, বৃষ্টির কারণে প্রচুর মেঘলা
ছিল আকাশ। বলতে না বলতেই একগুচ্ছ মেঘ এগিয়ে এলো আমাদের উপর আর শুরু হলো ঝুম
বৃষ্টি। গাড়ির ছাদের উপরে থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আর
সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টি উপভোগ করছিলাম…এ দৃশ্য কেবল দুচোখে উপভোগ করা যায়,
ক্যামেরায় কিংবা মুঠোফোনে এ দৃশ্য ধারণ করার মতো নয়। আমাদের গাড়ি
এবার খাড়া পথ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল আমরা সাজেকের রুইলুই পাড়ার খুব কাছেই এসে
পড়েছি। বৃষ্টি থেমে গেছে…বলতে না বলতেই আমরা ঢুকে পড়লাম মেঘের রাজ্যে, আশেপাশে ধোঁয়ার মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে… ঈষৎ ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে শরীরে।
মেঘেরও আলাদা এক ঘ্রাণ আছে, এ ঘ্রাণ আমি আগে কোথাও পাইনি…তাই
লিখে প্রকাশ করতে পারছিনা।
সাজেকে ঢুকেই চেকপোস্টের আগে আমরা
আবার গাড়ির ছাদ থেকে নেমে ভেতরে ঢুকে পড়লাম, সাজেকের
ধোঁয়ার মতো মেঘে ঢাকা রাস্তা গড়িয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। গাড়ি এসে থামলো “দার্জিলিং
রিসোর্ট” এর সামনে। গাড়ি থেকে নেমে আমরা রিসোর্টে চেক-ইন করে আমাদের বুক করে রাখা
রুমগুলো বুঝে নিলাম। মীর, আমি, আরশাদ ও
আরেকজন ভাইসহ আমরা উঠলাম দোতলার ২০৭ নম্বর রুমে। রুপম ভাই আমাদের ডিনার, নাস্তা, আগামীকালের ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের কুপন
বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। গোসল আর নামাজ শেষ করে আশপাশটা ঘুরে দেখলাম, রাতের খাবার আটটায়…জুম্ববি রেস্টুরেন্ট এ অর্ডার করা ছিল। গল্প-আড্ডা-আর
ঘোরাঘুরি শেষে সবাই মিলে রাতের খাবার খেতে চললাম, এখানকার
অধিকাংশ খাবারে শুধু বাশ আর বাশ। ব্যাম্বো চিকেন, ব্যাম্বো
বিরিয়ানি থেকে শুরু করে বাঁশ কোড়ল তো আছেই। ভাতের সাথে ব্যাম্বো চিকেন আর বাঁশ
কোড়ল এর সবজি ও ডাল দিয়ে আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে একটু
হাঁটাহাঁটি করে সবাই মিলে চললাম হেলিপ্যাড। অসংখ্য পর্যটক ভিড় করেছে এই হেলিপ্যাডে,
যেন ছোটখাটো এক নিউ মার্কেট। আরেকটা ট্যুরিং গ্রুপ ফানুস উড়ানোর
আয়োজন করছিল, যদিও প্রচন্ড বাতাসে তাদের ফানুস উড়ানোর
প্রচেষ্টা ব্যার্থ হয়। আমরা কয়েজন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম আর কথার প্রসঙ্গে
আবিষ্কার করলাম সৈকত ভাই কে। প্রেম, ভালোবাসা ও নারী-পুরুষের
প্রতি সম্মান প্রসঙ্গে মজার এক বক্তব্য রাখলেন ঝানু সৈকত ভাই…আর আবিষ্কার করলেন
চিঠির। একে একে সাক্ষাতকারও নিলেন তিনি। সিনিয়র ট্রাভেলার মাসুদ ভাই তো চিঠির শানে
নুজুল বুঝতে না পেরে কাঁচুমাচু হয়ে ছিলেন, পরে যখন বুঝতে
পারলেন…তার ফেলে আসা যুবক বয়সের কথা মনে পড়ে যায় আর আবেগে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।
সৈকত ভাই এর আলোচনা শেষে প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- “চিঠি ধরাতে হবে, মানে চিঠি দিতে হবে…নয়তো এভাবে সিঙ্গেল থেকে যাবেন।”
আড্ডার মাঝেই হঠাৎ করে নামল বৃষ্টি, হেলিপ্যাড ছেড়ে সবাই দিলো ভোঁ দৌড়…এই নিয়ে দ্বিতীয়বার
হেলিপ্যাড থেকে এমন দৌড় লাগাচ্ছি। দৌড়ে গিয়ে সবাই এক রেস্টুরেন্ট এ আশ্রয় নিলাম,
চা-কফি খেয়ে বৃষ্টি থামলে পরে আবার সবাই রিসোর্টে ফিরে এলাম।
রিসোর্টে এসে আরেক দফা আড্ডা শেষে এগারোটার দিকে সবাই চললাম রেস্টুরেন্ট এর দিকে,
বার্বিকিউ খেতে। খাওয়া-দাওয়ার আগে পুরো সাজেক মাতিয়ে তুলল শেয়ার
বেসিস টিমের ছেলেপিলেরা, রেস্টুরেন্ট এর সামনে জমে গেল
নাচ-গানের আসর…আরো দু-তিনটি গ্রুপ থেকে ছেলেপিলেরা এসে যোগ দিল। বাবার দরবারের
সামনে সব পাগলের খেলা জমে উঠল। নাচ-গানের আসর শেষে শেয়ার বেসিস টিমের লটারী
অনুষ্ঠিত হলো আর সবাইকে বিভিন্ন মজার মজার পুরস্কার দেয়া হলো। আমি পেলাম সাবান,
কটন আর দাঁত মাজার ব্রাশ। অন্যান্য মজার মজার পুরস্কারের মধ্যে ছিল
ফিডার, হারপিক, টুথপেস্ট, সাবান, শ্যাম্পু, সরিষার তেল
ইত্যাদি।
লটারী আর পুরস্কার বিতরণী শেষে আমরা
পরটা দিয়ে বার্বিকিউ খেয়ে আবার রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টে এসে যে যার মতো
গল্প-আড্ডা দিলো। এই ট্যুরের নাম দেয়া হয়েছিল লুসাই নদী ভ্রমণ, অথচ আমার জানামতে এখানে লুসাই নামের কোন নদী নেই। ভারতের
মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে কর্ণফুলীর উৎপত্তি, আর সাজেক
থেকে সেই পাহাড়ের সারি চোখে পড়ে। পরে জানলাম, রাতে মেঘগুলো
পাহাড়ের সারির সামনে অনেকটা নদীর মতো দেখায়…তাই মজা করে নাম দেয়া লুসাই নদী। ভোর
পাঁচটায় উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আমরা কয়েকজন চা খেয়ে বের হলাম হেলিপ্যাডের দিকে,
আবারো পর্যটকের ভিড়। এদিক ওদিক ঘুরে কিছু ছবি নিয়ে আবার ফিরে এলাম
রিসোর্টে, সকাল সাতটায় টিমের বাকি সবার সাথে রেস্টুরেন্টে
খিচুড়ি দিয়ে নাস্তা সেরে চললাম কংলাক পাহাড়ের দিকে। পাহাড়ের কিছু অংশ ট্রেকিং করে
উঠতে হয়, যেতে যেতে সামনে পড়ল দুয়েকটি টং। বাঁশের পাত্রে চা
খেলাম সবাই, এরপর হাঁটতে হাঁটতে কংলাক পাড়া…লুসাই জনগোষ্ঠী
অধ্যুষিত সাজেকের সর্বশেষ পাড়া। আর কংলাক পাহাড়ের চূড়া…সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া,
মেঘ খুব কাছ থেকে দেখা যায় এখানে। কংলাক পাহাড়ে মেঘ দেখা শেষে বেশ
ক্ষানিক্ষণ একাকি এককোণে বসে প্রকৃতির বিশালতা উপভোগ করলাম আর ক্রমেই সৃষ্টিকর্তার
সৃষ্টির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। ফেরার পথে পাহাড়ের চূড়ায় কিছু ছবি মুঠোফোনে
বন্দী করে নিলাম।


আসার পথে গাড়ী কাদামাটি বেয়ে উঠতে
পারছিল না, আবার পড়লাম সবাই বিপদে। সবার
সম্মিলিত চেষ্টায় টানা আর ঠেলায় পাইলট নূর আলম ভাই গাড়ি উপরে তুললেন। সাজেক জিরো
পয়েন্ট এসেই গাড়ি থেকে সবাই পড়িমরি করে নেমে একে একে ছবি তুলে নিলো। রিসোর্টে ফিরে
একটা রুমে সবাই ব্যাগপত্র রেখে বাকি রুমগুলো ছেড়ে দিলাম, বিকাল
তিনটার স্কটে রওনা দেব খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। বিষন্ন মন নিয়ে রিসোর্টের বারান্দায়
চেয়ারে বসে দূরের পাহাড়ে মেঘের খেলা দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই।
মীরের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় একটা বাজে, কয়েকজন মিলে
গেলাম হেলিপ্যাডের কাছের মসজিদে। নামাজ শেষ করে যখন ফিরে আসছিলাম দূরের সাদা-কালো
মেঘ আর বৃষ্টি চোখে পড়ল, দুয়েক মিনিট বাদেই মেঘ চলে এলো
আমাদের দিকে… আবারো বৃষ্টি, ছুটে গিয়ে বসলাম লুসাই হেরিটেজ
পার্কের এক চায়ের দোকানে। বাঁশের বেঞ্চিতে বসে ঝুম বৃষ্টি উপভোগ করছিলাম আর পাশে
থাকা এক আগন্তুকের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আবছার ভাই আনসার বাহীনি থেকে অবসর নিয়ে
কাঠের ব্যাবসা করছেন, দীর্ঘ সাত বছর যাবত আছে এই সাজেকে।
এলাকা সম্পর্কে অনেক তথ্য দিলেন তিনি। শান্তি বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে
চাইলে তিনি তাঁর গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন, আনসার বাহিনীতে
কর্মরত থাকাকালীন বেশ কয়েকবার এই দুর্ধর্ষ বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকে।
একবার তো গুলির শব্দে প্রায় বধির হয়ে যাবার মতো অবস্থা। এই শান্তি বাহিনী যে কত-শত
মানুষ,পর্যটক আর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রাণ নিয়েছে তার
কোন হিসাব নাই। লুসাই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার কিছু চিত্রও পরিলক্ষিত হলো, উপজাতি মেয়েরা পিঠে বাধা ঝুড়িতে করে পানি বোতল নিয়ে আসছে। সাজেকে পানির
খুব সংকট, অনেক নিচ থেকে ঝর্নার পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে
হয়।
বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ না দেখে ভিজে
ভিজে রিসোর্টে এলাম, এরপর ব্যাগপত্র আর
ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে। বাঁশ কোড়ল, দেশী মুরগি, ভর্তা আর ডাল দিয়ে লাঞ্চ শেষ করে গাড়ির
জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। এরই মধ্যে বাঁধল আরেক বিপত্তি, অন্য
গ্রুপের গাড়ির অবস্থা নাজেহাল হওয়ায় তারা গাড়ি পরিবর্তন করা ছাড়া যাবেনা। এদিকে
আমাদের গ্রুপের কেউ ওই গাড়িতে যাবে না। অনেক বাকবিতণ্ডা শেষে সৈকত ভাইয়ের পরামর্শে
আমরা আমাদের গাড়িতে উঠে পড়লাম। উপায়ন্তর না পেয়ে ওদেরও অন্য গাড়িতে আসতে হলো। আমরা
খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, সাজেকে তখন ঝুম বৃষ্টি।
ফেরার পথেও আমাদের সময়ের সাথে পাল্লা দিতে হলো, সন্ধ্যা
সাতটার বাস ধরতে হবে তাই। পাইলট নূর আলম ভাইয়ের রাফ ড্রাইভিং এ দু-তিনজন বমি করা
শুরু করল…আরেকজন তো মাথায় বাড়ি খেয়ে অবস্থা খারাপ। পুরো জার্নিতে এই চান্দের গাড়ির
ছাদে ভ্রমণটাই স্পেশাল, তাই শেষবারের মতো ছাদে উঠে পড়লাম।
রাতের আঁধারে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে হেডলাইট জ্বেলে জ্বেলে এগিয়ে চলছিল আমাদের
গাড়ি। ঠিক সাতটার পাঁচ মিনিট আগে এসে আমরা পৌঁছলাম খাগড়াছড়ি শান্তি পরিবহন বাস
কাউন্টারে।

বাসে উঠেই আমার প্রচুর ঘুম পাচ্ছিল, মানিকছড়ি পর্যন্ত দেড় ঘন্টার পথ পুরো শেয়ার বেসিস টিম যে যার
মতো রিলাক্সে ছিল। পাহাড়ে রাতের আকাশে চাঁদের জোছনা উপভোগ করতে করতে বাসভ্রমণ…আহ…
সে এক অপার অনুভূতি। মানিকছড়িতে যাত্রাবিরতির পর সৈকত ভাই আবার তার চিঠি নিয়ে
আলোচনা শুরু করলেন। পেছন থেকে আরেকটা ট্রাভেল গ্রুপের মেয়েদের গানের গলা ভেসে
আসছিল, আমরাও তাদের সাথে শুরু করে দিলাম গানের কলি। অন্য
ট্রাভেল গ্রুপের ছেলেমেয়েগুলো ছিল একেকটা হিন্দি গানের ক্যাসেট, আমাদের বাংলা গানের পুঁজি নিয়ে তাদের সাথে টেক্কা দিতে কষ্ট হচ্ছিল,
যদিও সৈকত ভাই একরকম একাই লড়ে যাচ্ছিল আর বারবার ওদের “ন”-এর গর্তে
ফেলছিল। যেন ক্ষণিকের জন্যে ফিরে গেলাম স্কুল-কলেজ আর ভার্সিটির ফেলে আসা
দিনগুলোতে…যেন কোন এক পিকনিকের বাস। রাত এগারোটার দিকে আমরা চলে আসলাম অক্সিজেন
বাস কাউন্টার, গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে বিদায় জানিয়ে ঘরের পথে
পা বাড়ালাম।
#পুনশ্চঃ রাতেই ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে
দেখলাম আমি একের পর এক বিড়ি টানছি। আসলে সত্য বলতে কি, আশেপাশে
সব কয়টা ছেলেপিলে এতো বেশি বিড়ি টানছিল যে তাদের বিড়ির ধোঁয়ায় ছোট ছোট মেঘের
সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে নিজেকে দমিয়ে রেখেছি, তাই এখন
স্বপ্নে বিড়ি টানছি। হঠাৎ সেই নীল পরী বিড়ির সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া থেকে বেরিয়ে এসে
আমায় বললো – “আমাকে দিবা এক টান?”